বাংলাদেশ

নতুন রূপে জামায়াতে ইসলামী: নির্বাচনী উত্থান ঘিরে মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ

  • 11:13 pm - January 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০৮ বার
ছবিঃ রয়টার্স

মেলবোর্ন, ২২ জানুয়ারি- দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগে সমালোচিত এবং এক দশকের বেশি সময় নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নতুন কৌশল ও বার্তা নিয়ে আবার মাঠে নামছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির এই পুনর্গঠন ও সক্রিয়তা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক মহল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মুসলিম-প্রধান প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে ২০২৪ সালের আগস্টে যুব নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই জামায়াত নিজেদের রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং তুলনামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে দলটি। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলই জামায়াতকে তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফলের আশা দেখাচ্ছে।

মার্কিনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের এক জনমত জরিপে জামায়াতকে সবচেয়ে ‘পছন্দের’ দল হিসেবে দেখানো হয়েছে। জরিপে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শীর্ষ অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, দলটি এখন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির পরিবর্তে কল্যাণমূলক রাজনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি চিকিৎসা শিবির আয়োজন, বন্যা ত্রাণ এবং আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদাহরণ দেন। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। শফিকুর রহমানের ভাষায়, গঠনমূলক রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করাই তাদের লক্ষ্য।

জামায়াতের শিকড় ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠা প্যান-ইসলামপন্থী আন্দোলনে। দলটি একসময় ইসলামী নীতিতে পরিচালিত সমাজের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বহু শীর্ষ নেতা দণ্ডিত হন বা কারাবন্দি হন, যে প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০১৩ সালে আদালত জামায়াতের গঠনতন্ত্রকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করলে দলটি নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ হয়।

গত বছর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পায়, যেখানে তারা জেনারেশন-জেডভিত্তিক ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিকে পরাজিত করে। এই এনসিপি গড়ে উঠেছিল শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই জামায়াত এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জোট দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা নরম করতে সহায়ক হতে পারে।

ঢাকার এক ব্যস্ত বাজারে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে ডাবের পানি বিক্রি করা মোহাম্মদ জালাল বলেন, তিনি নতুন রাজনৈতিক বিকল্প খুঁজছেন। তার মতে, জামায়াত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে এবং দেশের জন্য কাজ করার কথা বলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধর্মতত্ত্ববিদ শাফি মো. মোস্তফা মনে করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষই জামায়াতকে সীমিত পরিসরের দল থেকে আবার কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে। তার ভাষায়, আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার কারণে তৈরি হওয়া হতাশা জামায়াতকে নিজেদের নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।

জামায়াত এবার প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। দলটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তারা ইসলামী নীতিতে পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়।

তবে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ৩০০ আসনের কোনো একটিতেও নারী প্রার্থী না থাকলেও শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের পর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বরাদ্দ ৫০ আসনের মাধ্যমে নারীরা সংসদে প্রতিনিধিত্ব পেতে পারেন। নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষের শিরীন হক এসব প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ক্ষমতায় গেলে দলটি আবার তাদের মূল মতাদর্শে ফিরে যেতে পারে।

শেখ হাসিনার বিদায়ের পর দেশে কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। হিন্দু ও সুফি উপাসনালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া আয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে।

বাংলাদেশে হিন্দুরা সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু, জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। এরপর বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

জামায়াতের মুখপাত্র আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দলটি কখনো ধর্মের নামে সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতার পক্ষে ছিল না। তিনি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশীদার থাকা জামায়াত এবার দেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জোট করেছে, যাদের মধ্যে কিছু তুলনামূলকভাবে বেশি রক্ষণশীল। দলটি আগেভাগেই প্রার্থী বাছাই শুরু করে এবং ভোটার মনোভাব জানতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়।

জামায়াত জানিয়েছে, তারা ১৭৯টি আসনে প্রার্থী দেবে। এর মধ্যে ৭৪টি আসন এনসিপি ও অন্যান্য মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একটি দল জোট ছাড়ায় আরও ৪৭টি আসনের ভাগাভাগি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

মীর আহমদ বিন কাসেম, যিনি এক জামায়াত নেতার ছেলে এবং দীর্ঘ সময় আটক থাকার পর ২০২৪ সালে মুক্তি পান, বলেন, দলটি তাকে দেখিয়েছে যে মানুষ পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিতে ক্লান্ত এবং পরিবর্তন চায়। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি জামায়াতে যুক্ত হয়েছেন।

পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা চলছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে। তবে শফিকুর রহমান বলেন, দলটি কোনো দেশের প্রতি বিশেষ ঝোঁক রাখে না এবং সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেই আগ্রহী।

সব মিলিয়ে, নতুন বার্তা ও জোট রাজনীতির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী আবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে। তবে এই উত্থান দেশের মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করছে, তা নির্বাচনের ফলের পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

সুত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যুদ্ধ, বাণিজ্যিক অস্থিরতা এবং সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে,…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au