আংশিক খুলছে কাতারের আকাশপথ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংকারে লাখো ইসরায়েলি
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতার সীমিত পরিসরে তাদের আকাশপথ আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।…
মেলবোর্ন ২৪ জানুয়ারি: সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট প্রাপ্ত অডিও রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিকরা একসময় নিষিদ্ধ থাকা এই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই তথ্য শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। দলটি দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের সুযোগে জামায়াত আবার সক্রিয় ভূমিকা নেয়। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কি নিছক কূটনৈতিক যোগাযোগ, নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বাংলাদেশকে “ক্রমশ ইসলামী ধারায় ঝুঁকছে” বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করতে পারে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই বক্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে।
জামায়াত নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দলটি ক্ষমতায় এলে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছর ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থী ছাত্র সংগঠন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।
প্রতিবেদন আরও জানায়, এক পর্যায়ে ওই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, জামায়াত যদি কঠোর ইসলামী আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারে। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, ওয়াশিংটন একদিকে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগের বার্তাও দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো—এটি কি গণতন্ত্র রক্ষার কৌশল, নাকি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের হিসাব?
এ বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই আলোচনা ছিল নিয়মিত ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না এবং বাংলাদেশের জনগণ যে সরকার নির্বাচন করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করবে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্র শাখার মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকের প্রসঙ্গে তারা কোনো মন্তব্য করবেন না। এই নীরবতাও রাজনৈতিক বার্তার মতোই তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যোগাযোগ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ১৯৭১ সালের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইছে? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন যখন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তখন তা ছিল ইতিহাসের এক নির্মম ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। আজ আবার দেখা যাচ্ছে, সেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে উঠছে। এই সমীকরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির নৈতিক ভিত্তির জন্য এক গভীর সংকেত।
আমরা যদি স্মরণ করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯-তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ২৭শে সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। উপস্থাপকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,
আমরা ‘রিসেট বাটন’ পুশ করেছি; এভ্রিথিং ইজ গন; অতীত নিশ্চিতভাবে চলে গেছে। এখন নতুন ভঙ্গিতে আমরা গড়ে তুলবো। দেশের মানুষও তা চায়। সেই নতুন ভঙ্গিতে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সংস্কার করতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেই বক্তব্য আবার বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আসলে বাংলাদেশকে নিয়ে কি বার্তা দিতে যাচ্ছে?
প্রশ্ন উঠেছে এমন সমীকরণ শুধু বর্তমান রাজনীতিকে নয়, বরং ইতিহাসের মূল্যবোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট ছাড়াই পরিচালিত এই সরকার কি আন্তর্জাতিক শক্তির আশীর্বাদে নিজেদের জন্য একটি ‘নিরাপদ প্রস্থান (safe exit) পরিকল্পনা’ তৈরি করছে সেটা অন্তত পরিষ্কার। মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভাষ্যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা শোনা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই ভাষ্যের সঙ্গে কর্মকৌশলের বিস্ময়কর বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখতে চাইছে, যেখানে ইতিহাসের বিতর্কিত শক্তিগুলো আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার সম্ভাবনা এখন তীব্র।
বাংলাদেশের জনগণের জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় আসবে তা নয়, বরং কোন আদর্শ, কোন ইতিহাস এবং কোন মূল্যবোধ রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হবে। যদি বিদেশি শক্তির ভূরাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়, তবে তা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো জাতির গণতন্ত্র টেকসই হয় না। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা কোনো কূটনৈতিক সমীকরণের কাছে সমর্পণ করার অধিকার কারও নেই।
বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত এবং বর্তমান সমীকর বাংলাদেশের সামনে আজ সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কী বার্তা দিতে চাইছে? তাহলে কি গণতন্ত্রের নামে আবারও ইতিহাসের ভুল পথে হাঁটার প্রস্তুতি নেওয়া সম্পন্ন?
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au