ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ জানুয়ারি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে কিশোরদের কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় প্রশাসনিক দায়িত্ব, ক্ষমতার সীমা এবং ছাত্র প্রতিনিধিত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন শাস্তিমূলক আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েই এখন মূলত সমালোচনা জোরালো হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ৬ জানুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে খেলতে আসা প্রায় ৩০ জন কিশোর ও তরুণকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে কান ধরিয়ে উঠবস করান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
রোববার মাস্টার দা সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবিদুর রহমান মিশু ফেসবুকে ভিডিওটি পোস্ট করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ডাকসুর একজন সদস্য নিজেকে কার্যত প্রক্টরের ভূমিকায় বসিয়ে বহিরাগত কিশোরদের শাস্তি দিয়েছেন। তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলতে আসা কোনো কিশোর যদি নিয়ম ভঙ্গ করে থাকে, তবে তার বিচার করার এখতিয়ার প্রশাসনের, কোনো ছাত্র প্রতিনিধির নয়। তিনি এটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভিন্নধারার শাসন ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় প্রায় ৩০ জন কিশোর ও তরুণ সারিতে দাঁড়িয়ে কান ধরে উঠবস করছেন। তাদের সামনে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সর্বমিত্র চাকমা। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগ নাকি প্রকাশ্য অপমানের মাধ্যমে ভয় দেখানোর চেষ্টা।
সমালোচনার মুখে সর্বমিত্র চাকমা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিতভাবে বাইরের লোকজন খেলতে আসে এবং তাদের বাধা দিলে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটে। মাঠের আশপাশে চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং বহুবার নিষেধ করার পরও বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ হয়নি।
কান ধরিয়ে উঠবস করানোর বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সেদিন সেখানে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য ও অন্যান্য কর্মচারীরাও উপস্থিত ছিলেন। তার দাবি, টেকসই কোনো সমাধান না থাকলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান সর্বমিত্র চাকমা। আরমান হোসেন বলেন, বহিরাগতদের কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে বলে তারা বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছেন, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সে কারণেই তারা মৌখিকভাবে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদের বক্তব্য বিষয়টিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে। তিনি বলেন, কোনো ছাত্র প্রতিনিধি আদৌ এভাবে শাস্তি দিতে পারেন কিনা, সেটি সরলভাবে বলা যায় না। আগে পুরো ঘটনা বুঝতে হবে। ভিডিওটি দেখার পরই বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
এই ঘটনায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, শৃঙ্খলা রক্ষার নামে একজন ডাকসু সদস্যের এমন আচরণ কতটা বৈধ এবং নৈতিক। সমালোচকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব প্রশাসনের। ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানবিক আচরণের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মত দিচ্ছেন অনেকে।