নৈতিকতার নামে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
মেলবোর্ন, ২৯ জানুয়ারি: রাজনৈতিক আন্দোলন বিশ্বাসের ভাষায় কথা বললেই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে না; বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন কোনো আন্দোলন নিজেকে নৈতিকতার একমাত্র অধিকারী বলে দাবি করে। ব্রিটিশ দার্শনিক ইসাইয়া বার্লিনের চিন্তা থেকে অনুপ্রাণিত এই উপলব্ধি আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা শাসনের পতনের পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন মোড়ে। পুরোনো শাসনের দুর্নীতি ও দমননীতির শূন্যতায় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী নিজেকে তুলে ধরছে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও “নৈতিক” বিকল্প হিসেবে। কিন্তু এই বাহ্যিক সংযমের আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে—আদর্শিক চরমপন্থায় আবদ্ধ একটি দল কি বহুত্ববাদী গণতন্ত্র পরিচালনা করতে পারে? আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এই প্রশ্নের আংশিক উত্তর দেবে।
জামায়াতে ইসলামী দক্ষতার সঙ্গে “দ্বৈত বার্তা” কৌশল প্রয়োগ করছে। কূটনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তারা সংবিধানবাদ, গণতন্ত্র ও শরিয়াহ আইন তৎক্ষণাৎ প্রয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা বিশ্বকে বোঝাতে চায়—তারা কেবল একটি শান্তিপূর্ণ ধর্মভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রাম ও জনপদে যেখানে নির্বাচন জেতা হয়, সেখানে নাগরিক দায়িত্বের ভাষা নয়—প্রাধান্য পাচ্ছে ধর্মীয় কর্তব্যের বয়ান। ভোট এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ঈমানের পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে। জামায়াতের পক্ষে ভোট দেওয়া “সওয়াবের কাজ”, আর বিপক্ষে ভোট দেওয়া নৈতিক অবক্ষয়ের সমান। ব্যালট বাক্সকে পরকালীন মুক্তির দ্বার হিসেবে উপস্থাপন করে তারা কার্যত বিরোধীদের ধর্মীয়ভাবে নির্বাসিত করছে। জামায়াত-ঘনিষ্ঠ নেতারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন—দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়া ঈমানি দায়িত্ব।
জনসংযোগের এই প্রচারণা সত্ত্বেও জামায়াতের মূল দর্শন অপরিবর্তিত। তাদের সংবিধানে এখনও বলা আছে—সার্বভৌমত্ব মানুষের নয়, একমাত্র ঈশ্বরের। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এখনও ‘ইকামাতে দ্বীন’—অর্থাৎ ইসলামকে সর্বগ্রাসী জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এই দর্শনে রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের রক্ষক নয়, বরং নৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার। আইনকে অধীন করা হয় নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার, আর জনগণের সার্বভৌমত্বকে দেখা হয় সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের মূল ভিত্তি—সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি। যে দল সত্যিই এসব নীতিতে বিশ্বাস করে, তাকে প্রথমেই নিজের আদর্শকে এসব মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হতো। বাস্তবিক অর্থে, জামায়াত তা করেনি।
নারীদের বিষয়ে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আদর্শিক কঠোরতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দলটির আমির ড. শফিকুর রহমান ও শীর্ষ নেতৃত্ব এমন সামাজিক নীতির ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা নারীদের গৃহবন্দিত্বকে “পুরস্কৃত”, কর্মঘণ্টা সীমিত এবং চলাচল নিয়ন্ত্রিত করতে চায়। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে তারা সমস্যা হিসেবে দেখছে—যেখানে নারীরা বাংলাদেশের প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
দেশের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক শিল্পের মেরুদণ্ড মূলত নারী শ্রমিক। এই বাস্তবতায় জামায়াতের প্রস্তাবিত নীতি জাতীয় পশ্চাদপসরণের রূপরেখা ছাড়া কিছু নয়।
নারীদের বাদ দেওয়ার প্রবণতা ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পরিষদে একজন নারীও নেই। যখন দলীয় নেতারা বলেন, নারীদের কেবল নারীদের সামনে পরিবেশন করা উচিত, তখন তা প্রকাশ্য জীবন, গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নারীদের দৃশ্যমানতা মুছে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
আইন প্রণয়ন না হলেও বিপদ জন্ম নেয় তথাকথিত “নৈতিক নজরদারি” থেকে—যেখানে সমাজের অদৃশ্য চাপ দিয়ে মানুষের ওপর “গ্রহণযোগ্য আচরণ” চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রবণতার ভয়াবহ ইঙ্গিত আমরা ইতোমধ্যেই বাস্তবে প্রত্যক্ষ করেছি।
গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ‘ওড়না ঠিকভাবে না পরার’ অভিযোগে প্রকাশ্যে হয়রানি করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে তাকে মুক্ত করার দাবিতে ইসলামপন্থী আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামে। জামিনে মুক্তির পর তাকে ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই দৃশ্য এক ভয়ংকর বার্তা দেয়—আইনের ওপর নৈতিকতার দাবিকে প্রাধান্য দেওয়া যায়, জনতার চাপ দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া পাল্টানো যায়। আদালতের পরিবর্তে যখন পাড়া-মহল্লায় আদর্শিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে প্রদর্শনী, আর প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা নেয় জনতার শাসন।
সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের দাবি রেখেই তুরস্কে একে পার্টি ধীরে ধীরে রক্ষণশীল সামাজিক বিধি জোরদার করেছে। আফগানিস্তানে এই প্রবণতার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল নারীদের প্রকাশ্য জীবন থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলোপ—যেখানে সমাজ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসর থেকে নারীদের ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের সাম্প্রতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ—যেমন একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন—আদর্শিক রূপান্তরের চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলেরই প্রতিফলন বেশি। ধর্মীয় নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈধতা খোঁজে, তা সংখ্যালঘুদের কেবল সহ্য করতে পারে, কিন্তু সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এমন কাঠামোয় ভিন্নমত সহজেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পরিণত হয়, আর মতভেদ ধীরে ধীরে রূপ নেয় নৈতিক অপরাধে।
দার্শনিক কার্ল পপার সতর্ক করেছিলেন—অসীম সহনশীলতা শেষ পর্যন্ত সহনশীলতারই বিনাশ ডেকে আনে। আজ বাংলাদেশের সামনে বিপদ কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কর্তৃত্ববাদ নয়; বরং আরও ভয়ংকর এক বাস্তবতা হলো সমাজের ভেতর থেকেই জন্ম নেওয়া নৈতিক স্বৈরাচার, যা ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ক্ষয় করে দেয়।
বাংলাদেশের মানুষ অতীতের ব্যর্থতায় ক্লান্ত—এটি সত্য। কিন্তু পরিবর্তন মানেই অগ্রগতি নয়।
যদি জামায়াত নৈতিকতার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে আইনি জবাবদিহিতার জায়গা দখল করবে তথাকথিত নৈতিক নিশ্চিততা। আর তার প্রথম শিকার হবে সেই বহুত্ববাদী মূল্যবোধ, যার ওপর ভর করেই জামায়াত রাজনীতিতে উত্থানের সুযোগ পেয়েছিল।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন সচেতন জনগণের ওপর, যারা নৈতিক প্ররোচনা ও নৈতিক চাপের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে সক্ষম। এখন দেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নৈতিকতার মুখোশে লুকিয়ে থাকা সমরূপতার দাবি কি তার গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে পারবে, নাকি এই দাবি নিজেই গণতন্ত্রের সহনশীলতার সীমা ভেঙে দেবে?
মূল লেখা: কাজী জেসিন, Asia Times
কাজী জেসিন একজন সাংবাদিক এবং রাজনীতি এবং বর্তমান বিষয়ের উপর বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় টেলিভিশন টক শো উপস্থাপনা করেন।
অনুবাদ: ড. প্রদীপ রায়, সম্পাদক OTN Bangla