চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ২৯ জানুয়ারি- ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আহত বহু মানুষ গ্রেপ্তার এড়াতে গোপনে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি ও হাসপাতালে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তারা ঘরে বসে কিংবা পরিচিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন আহতদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবীরাও নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে এক বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন ‘তারা’ নামের এক বিক্ষোভকারী ও তার বন্ধু। নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করে তিনি জানান, মোটরসাইকেলে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জনতার দিকে চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসে। তার বন্ধু গুলি না করার অনুরোধ জানালেও এক সশস্ত্র সদস্য তাদের লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালায়। গুলিতে তারা দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাদের পোশাক রক্তে ভিজে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন মানুষ সাহায্য করে তাদের একটি গাড়িতে তুলে নেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার কথা উঠতেই তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা বলেন, হাসপাতালে গেলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে ভরা রাস্তায় তারা এক দম্পতির বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং ভোর পর্যন্ত সেখানেই লুকিয়ে থাকেন। পরে পরিচিত এক চিকিৎসকের মাধ্যমে ক্ষত পরিষ্কার করা হয়। একজন সার্জন ঘরেই কিছু গুলি ও ধাতব অংশ অপসারণ করতে পারলেও সতর্ক করে দেন যে, সবকিছু শরীর থেকে বের করা সম্ভব হয়নি এবং কিছু ক্ষত চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।
ইরানজুড়ে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাজ সীমিত করায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। আরও ১৭ হাজারের বেশি মৃত্যুর খবর তারা যাচাই করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া কমপক্ষে ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আহত অনেকেই বিবিসিকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা হাসপাতালে যেতে পারেননি। ফলে বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভর করছেন আহতরা। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং আহতদের শনাক্ত করতে নিয়মিত মেডিকেল রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তেহরানের এক সার্জন নিমা জানান, ৮ জানুয়ারি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের দিন তিনি কাজে যাওয়ার পথে রাস্তায় বহু তরুণকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি একজন আহতকে নিজের গাড়ির বুটে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যান। পথে সশস্ত্র বাহিনী তাকে থামালেও হাসপাতালের পরিচয়পত্র দেখানোর পর যেতে দেয়। তিনি বলেন, প্রায় চার দিন ধরে একটানা অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে, ঘুম বা বিশ্রামের সুযোগ ছিল না। হাসপাতালের পোশাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কাপড় সবই রক্তে ভিজে ছিল।
নিমা আরও জানান, অনেক তরুণের মুখ, পা ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুলি লেগেছে। কারও কারও ক্ষেত্রে সংক্রমণ ও জটিলতার কারণে অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে, ফলে তারা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছেন।
সরকারি হিসেবে ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, চলমান পরিস্থিতিতে তিন হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তারা বলছে, নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা সাধারণ পথচারী, যারা তথাকথিত দাঙ্গাবাজদের হামলার শিকার হয়েছেন। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, মানুষের আস্থার কারণে সাম্প্রতিক দিনে প্রায় তিন হাজার মানুষ বাড়ির চিকিৎসা ছেড়ে হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাত পাওয়া ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২০০ জনকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বেশিরভাগ রোগীকেই ৮ জানুয়ারির পর ভর্তি করা হয়।
আরাক শহরের এক বাসিন্দা সাইদ জানান, বিক্ষোভ চলাকালে তার এক বন্ধুর চোখে গুলি লাগে এবং চোখ বিকৃত হয়ে যায়। স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে তেহরানের বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নার্সরা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আহত বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালের পেছনের দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। সাইদের বন্ধু দুইবার অস্ত্রোপচার করান এবং সার্জন কোনো ফি নেননি।
একজন স্বাস্থ্যকর্মী জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে অনেক চিকিৎসক মেডিকেল রেকর্ডে গুলির ক্ষতের উল্লেখ এড়িয়ে যাচ্ছেন। তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তির ভাই সিনা বলেন, হাসপাতালটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো ছিল। আহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে কম্বল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দেয়। এমনকি কম্বল আনতে বাড়ি থেকে আনতে বলা হয়েছিল।
ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসির হাতে আসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকেই আহতদের তুলে নিয়ে গেছে নিরাপত্তা বাহিনী এবং পরে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকরাও এখন ঝুঁকিতে রয়েছেন।
নরওয়েভিভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা বন্ধ করতে এবং মানুষকে ভয় দেখাতে চিকিৎসকদের টার্গেট করা হচ্ছে। উত্তর ইরানের কাজভিন শহরের সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনিকে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতার অভিযোগ আনা হয়েছে, যার শাস্তি ইরানি আইনে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানে আহত বিক্ষোভকারীদের জন্য চিকিৎসা নেওয়াই এখন জীবন-মরণের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ লড়াই হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au