চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ৩০ জানুয়ারি- রাশিয়ায় বেসামরিক চাকরির আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর জোর করে এসব বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে সই করানো হয় এবং পরে তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন মাকসুদুর রহমান জানান, বাংলাদেশে থাকা এক শ্রম দালাল তাঁকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠান। বলা হয়েছিল, মস্কোতে নিরাপদ একটি বেসামরিক চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
এপি তিনজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে, যারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। তারা জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করতে বাধ্য করা হয়। তখন তারা বুঝতে পারেননি সেগুলো কী। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তিপত্র। এরপর তাদের একটি সেনা প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ড্রোন পরিচালনা, আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মাকসুদুর রহমান বলেন, তিনি যখন এই কাজের প্রতিবাদ করেন, তখন এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করে তাকে জানান, তার এজেন্টই তাকে এখানে পাঠিয়েছে এবং রাশিয়া তাকে কিনে নিয়েছে। এই কথায় তিনি পুরো বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য করা হতো। এর মধ্যে ছিল রুশ সেনাদের আগে আগে এগিয়ে যাওয়া, যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ বহন, আহত সেনাদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়া। তারা বলেন, সামনে থাকা এসব কাজের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি।
এ ছাড়া আরও তিনজন নিখোঁজ বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে এপি। তারা জানান, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাদের স্বজনেরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। এরপর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
মাকসুদুর রহমান আরও বলেন, কাজ করতে অস্বীকার করলে তাদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হতো। অনেক সময় মারধরও করা হতো। তিনি বলেন, সেনারা চিৎকার করে বলত, কেন কাজ করছ না, কেন কাঁদছ। এরপর লাথি মারত। প্রায় সাত মাস এমন অবস্থায় থাকার পর সুযোগ পেয়ে তিনি পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
এপি যে নথিগুলো পর্যালোচনা করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিপত্র, চিকিৎসা ও পুলিশি প্রতিবেদন এবং যুদ্ধের সময় পাওয়া আঘাতের ছবি। এসব নথি প্রমাণ করে যে তারা সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
কতজন বাংলাদেশি এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে ভুক্তভোগীরা এপিকে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তারা শত শত বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে দেখেছেন।
এই বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কেউ কোনো জবাব দেয়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একই কৌশলে রাশিয়া ভারত, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও টার্গেট করেছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকদের জোরপূর্বক ব্যবহার এবং শোষণের বিষয়টি নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস(এপি)