মেলবোর্ন, ৩০ জানুয়ারি: গভীর রাজনৈতিক বিভাজন, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং সহিংসতার আশঙ্কার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় ভোট, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার ও আইন সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) জানিয়েছে, গত বছর দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৪,৭৪৪ জন আহত হয়েছেন।
বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তি ও নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই নির্বাচনে নতুন সংসদ গঠনের পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কার নিয়েও ভোট হবে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)। এনসিপি গঠিত হয়েছে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে, যা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে।
যেসব রাজনৈতিক শক্তি একসময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল, তারা এখন সংস্কার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নির্বাচনটি পরিণত হয়েছে সংস্কার বনাম বর্তমান ব্যবস্থা, বৈধতা বনাম ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে।
এবার ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২৭ মিলিয়ন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি। প্রায় ২,০০০ প্রার্থী থেকে সংসদের ৩০০টি আসনে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন।
সহিংসতার ধারাবাহিকতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, “বাংলাদেশে নির্বাচনের সঙ্গে সহিংসতা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আদর্শিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এ ধরনের সংঘাতকে উসকে দেয়।”
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া ৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে এখনো ১,৩৩৩টি উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনের আগে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে উঠে আসা তরুণ নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পুলিশের মতে, হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। কিয়ানের মতে, ক্ষমতার লড়াই ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
মনিটরিং সংস্থাগুলোর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সহিংসতার একটি বড় অংশ ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে, বিশেষ করে মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের ঘিরে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংস্কার বনাম স্থিতাবস্থা
বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাকারিয়া পোলাশ বলেন, “নির্বাচনকে দলগুলো এখন জীবন-মরণের লড়াই হিসেবে দেখছে।” তাঁর মতে, জামায়াত ও এনসিপি সংস্কারপন্থী অবস্থানে থাকলেও বিএনপি সব সংস্কার গ্রহণে পুরোপুরি আগ্রহী নয়। ফলে দেশের রাজনীতি এখন “সংস্কারপন্থী বনাম স্থিতাবস্থাপন্থী” বিভাজনে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক ভাষ্যও ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। বিএনপি জামায়াতকে ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করছে, আর জামায়াত বিএনপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।
দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থার সংকট
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। কিয়ান বলেন, আইন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত তদন্ত সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে।
জাকারিয়া পোলাশ সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের দিন দেশের হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে, কারণ ২০২৪ সালের আগস্টের পর নতুন নিয়োগ হয়নি এবং অনেক কর্মকর্তা আগের সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে সংকটকালে কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় দ্বন্দ্ব
এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন। নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো ভোটের মাধ্যমে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
লিভারপুল হোপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালমান আল-আজামি বলেন, “শেখ হাসিনার পতনের পর সবাই বুঝেছে, ভবিষ্যতে কেউ যেন স্বৈরশাসক হতে না পারে, সে জন্য সংস্কার জরুরি।”
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও এনসিপি তরুণ ও সংস্কারপন্থী ভোটারদের আকর্ষণ করছে, আর বিএনপি মূলত প্রবীণ ও অভিজাত শ্রেণির সমর্থন পাচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে।
পোলাশ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পক্ষ নিচ্ছে। তাঁর মতে, কিছু গণমাধ্যম বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলছে।
আঞ্চলিক রাজনীতিও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, প্রতিবেশী দেশের প্রভাব ও ভয় প্রদর্শন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অন্যদিকে, ভারত শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। সালমান আল-আজামির মতে, বিএনপি বিজয়ী হলে জামায়াত ফলাফল মেনে নিতে পারে, তবে বিপরীত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ রয়েছে।
থমাস কিয়ান সতর্ক করে বলেন, যেই দলই ক্ষমতায় আসুক, নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তবুও বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের বিকল্প নেই। পোলাশ বলেন, “দেশের জন্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।”
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে এই নির্বাচনের ওপর—যেখানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্র, সংস্কার এবং রাষ্ট্রের পথনির্দেশ নির্ধারিত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন: Berk Kutay Gokmen |
অনুবাদ ও সম্পাদনা: OTN Bangla