মেলবোর্ন, ৩১ জানুয়ারি- ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তপ্ত দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলছিল ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা। অস্ত্রের ঝনঝনানি না থাকলেও আকাশ ও মহাকাশজুড়ে চলত নীরব নজরদারি। সেই গোপন লড়াইয়েরই এক অদৃশ্য প্রহরী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাম্পসিট’ গুপ্তচর স্যাটেলাইট কর্মসূচি, যার বহু তথ্য সম্প্রতি গোপনীয়তার তালিকা থেকে অবমুক্ত করেছে ন্যাশনাল রিকনেসান্স অফিস (এনআরও)।
প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করা এই স্যাটেলাইটগুলো এতদিন ছিল ইতিহাসের আড়ালে। এখন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে এর কার্যক্রম, নকশা ও কৌশলগত গুরুত্বের নানা দিক।
গোপন উৎক্ষেপণ, অজানা মিশন
এনআরওর তথ্যমতে, ১৯৭১ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ‘জাম্পসিট’ (AFP-711 নামেও পরিচিত) কর্মসূচির আওতায় মোট আটটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়। এর একটি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হলেও বাকিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এনআরওর ‘প্রোগ্রাম এ’-এর অধীনে স্যাটেলাইটগুলো তৈরি করে এবং টাইটান IIIB রকেটের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যান্ডেনবার্গ এয়ার ফোর্স বেস থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়।
এই উৎক্ষেপণগুলোর মিশন নম্বর ছিল ৭৭০১ থেকে ৭৭০৮। এতদিন বিশ্লেষকেরা অনুমানের ভিত্তিতে এগুলোর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করলেও এখন এনআরওর আংশিক অবমুক্ত নথিতে মিলেছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
সিগন্যাল গোয়েন্দাগিরির অগ্রদূত
জাম্পসিট ছিল একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা SIGINT স্যাটেলাইট। রেডিও যোগাযোগ, রাডার সিগন্যাল, ক্ষেপণাস্ত্রের টেলিমেট্রি- সবই ছিল এর নজরদারির আওতায়। সামরিক বাহিনীর যোগাযোগে আড়ি পাতা (COMINT) এবং বিদেশি অস্ত্র ব্যবস্থার ইলেকট্রনিক সিগন্যাল বিশ্লেষণ (FISINT)- এই দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জাম্পসিট।
বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ রাডার ছিল এই স্যাটেলাইটের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
বিশেষ কক্ষপথে বিশেষ নজর
জাম্পসিটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর কক্ষপথ। এটি কাজ করত উচ্চ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে- যাকে হাইলি এলিপটিক্যাল অরবিট (HEO) বলা হয়। এই কক্ষপথে স্যাটেলাইট উত্তর মেরু অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করতে পারত, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নজরদারির জন্য আদর্শ।
এই ধরনের কক্ষপথ ‘মোলনিয়া অরবিট’ নামেও পরিচিত, যা আগে সোভিয়েত স্যাটেলাইটগুলো ব্যবহার করত। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের কৌশলই কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ঠান্ডা যুদ্ধের ছায়া
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে কমিউনিজমের বিস্তার ও পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ প্রমাণ করে দেয়-মহাকাশও আর নিরাপদ নয়।
এই বাস্তবতায় ‘গ্র্যাব’, ‘পপি’, ‘পার্কেই’–এর মতো আগের ইলেকট্রনিক নজরদারি স্যাটেলাইটের ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় জাম্পসিট, যা মহাকাশ থেকে সিগন্যাল গোয়েন্দাগিরিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
অবসান, কিন্তু উত্তরাধিকার রয়ে গেছে
এনআরও জানায়, জাম্পসিট স্যাটেলাইটগুলো ২০০৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স কাঠামোর অংশ ছিল। এরপর ধীরে ধীরে সেগুলো অবসর নেয়। ধারণা করা হয়, ‘ট্রাম্পেট’ নামের আরো উন্নত স্যাটেলাইট সিরিজ জাম্পসিটের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বর্তমানে শুধু রাষ্ট্রীয় সংস্থাই নয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও সিগন্যাল সংগ্রহে সক্ষম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করছে। ভবিষ্যতে শত শত ছোট স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে গঠিত কনস্টেলেশন বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নীরব প্রহরীর ইতিহাস
এনআরওর এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, জাম্পসিটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মহাকাশ থেকে সিগন্যাল গোয়েন্দাগিরির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে এই কর্মসূচি।
যুদ্ধ ছাড়াই যুদ্ধ জয়ের কৌশলে, ঠান্ডা যুদ্ধের সেই নীরব অধ্যায়ে-‘জাম্পসিট’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক অদৃশ্য কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রহরী।
সূত্র: দ্য ওয়ারজোন