মার্কিন হামলার আশঙ্কায় খাবার, পানি ও ওষুধ মজুত করছে ইরানিরা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ ফেব্রুয়ারি- যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার গুজবকে কেন্দ্র করে ইরানের ভেতরে ও বাইরে বসবাসকারী ইরানিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ৩০ জানুয়ারি রাত নামার পর থেকেই এই আশঙ্কা আরও গভীর হয়। অনেক মানুষ সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। বিস্ফোরণের শব্দ শোনার অপেক্ষায় উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কেটেছে তাদের।
তেহরানে বসবাসরত ৪৩ বছর বয়সী এক প্রকৌশলী মিলাদ বলেন, তিনি সারারাত বারবার ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছেন। তার মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে হামলা হতে পারে। এই ভয়ের অনুভূতি শুধু তরুণদের মধ্যে নয়, প্রবীণদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে।
৩১ জানুয়ারি সকালে তেহরানের পূর্বাঞ্চলের একটি পার্কে শরীরচর্চা শেষে বাড়ি ফিরে ৬৮ বছর বয়সী শোহরেহ বলেন, তার প্রায় সব বন্ধুই তাকে বলেছেন যে ওই রাতেই হামলা হতে পারে। তিনি বিদেশি সামরিক হামলার বিরোধিতা করলেও মনে করেন, রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণে মানুষ এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছে যে অনেকেই আর পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় বিচার করতে পারছে না।
গত এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের মার্কিন সামরিক বহর মোতায়েনের খবর ইরানে সংঘাতের আশঙ্কাকে বাস্তব করে তুলেছে। এই সামরিক তৎপরতা একদিকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন অস্ত্রচুক্তির ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে প্রবল মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের ক্ষত। ২৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইরান। সরকারি হিসাবে ওই অভিযানে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। নিহতদের বড় অংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার সম্ভাব্য হামলার জন্য নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন ৩২ বছর বয়সী এক সরকারি কর্মচারী আরজু বলেন, সমাজজুড়ে এক ধরনের নীরব উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তার এক প্রতিবেশী জানালাগুলো সিল করে দিয়েছেন। প্রতিবেশীর ভাষায়, বোমা পড়লে সরকারপন্থী আর বিরোধীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
ইন্টারনেট সংযোগ আবার চালু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ টিকে থাকার নানা পরামর্শ। সেখানে বলা হচ্ছে অন্তত ১০ দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখতে, জরুরি কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী সংগ্রহ করে রাখতে।
৭৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আমিন জানান, তিনি তিন মাসের ওষুধ কিনে রেখেছেন। তার ভাষায়, সামনে কী হতে যাচ্ছে কেউ জানে না, তাই সাবধান থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। ইরান-ইরাক যুদ্ধসহ একাধিক সংকট দেখেছেন এমন এই প্রবীণের আশঙ্কা, নতুন কোনো যুদ্ধ হলে দেশের অবশিষ্ট সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে।
এই আতঙ্ক শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রায় ৪০ লাখ ইরানি প্রবাসীর মধ্যেও গভীর দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। তারা আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।
ফিনল্যান্ডে বসবাসরত ফাতেমেহ বলেন, তেহরানে থাকা তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত। তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে তিনি বন্ধুদের দিয়ে খাবার ও ওষুধ কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
সব মিলিয়ে ইরানের শহরগুলোতে আপাতত স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই চলছে। দোকান খোলা, মানুষ কাজে যাচ্ছে, শিশুরা স্কুলবাসের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে জমে আছে গভীর ভয়।
২৭ বছর বয়সী ছাত্র সোরুশ বলেন, মানুষ এবার জানে যুদ্ধ কেমন হয়। প্রকাশ্যে আতঙ্ক কম, কিন্তু ভেতরের ভয় অনেক গভীর। আর ৪১ বছর বয়সী সাবা বলেন, তাদের শাসকেরা মানুষ হত্যা করে, বিরোধীরা নিজেদের স্বার্থ দেখে, আর দেশের শত্রু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতার হাতে। তার কথায়, তারা সত্যিই দুর্ভাগা।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই।