মেলবোর্ন, ১ ফেব্রুয়ারি- ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। তবে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে অত্যন্ত পরিচিত এই মাসের শুরুটা এবার ভিন্ন আবহে। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা ভেঙে ভাষার মাসের প্রথম দিনে শুরু হয়নি অমর একুশে বইমেলা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত সময়ে বইমেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি, ফলে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বইমেলার চেনা আমেজ দেখা যায়নি।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নানা কর্মসূচির পাশাপাশি বইমেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর বইয়ের উৎসব মিলিয়ে সাধারণত ভাষার মাসের শুরুটা হয়ে থাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এবার সেই পরিচিত দৃশ্য অনুপস্থিত থাকায় ভাষার মাসের সূচনাতেই ভিন্নতা চোখে পড়ছে।
ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে শুধু একটি ক্যালেন্ডারের মাস নয়। এটি আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ এবং ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে জীবন উৎসর্গ করেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাঙালির জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষার অধিকার। সেই স্মৃতিকে সম্মান জানাতে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে পালিত হয় নানা কর্মসূচি।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে। সে বছর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। একই বক্তব্য তিনি কার্জন হলেও দেন। সে সময় উপস্থিত কয়েকজন ছাত্র এর প্রতিবাদ জানান এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্মারকলিপি দেন। এখান থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়।
এর আগে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র ও অধ্যাপক গড়ে তোলেন তমদ্দুন মজলিস। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সভা, আলোচনা ও প্রচারের মাধ্যমে সংগঠনটি আন্দোলনকে সংগঠিত করে। পাশাপাশি গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত রূপ দেয়।
১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এরপর ১১ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদসহ ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব এবং বাংলা হরফ বাতিলের উদ্যোগ আন্দোলনে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ও শিক্ষাবিদরা সংগঠিত হন। একপর্যায়ে সরকার আন্দোলন দমনে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা মিছিল বের করেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন একাধিক তরুণ। তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার অধিকার বাঙালির রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
ভাষা আন্দোলনের সেই ধারাবাহিকতা থেকেই পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি হয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি তাই আজও বাঙালির ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার সবচেয়ে গভীর প্রতীক হয়ে রয়েছে।