বাংলাদেশ

বাংলাদেশে নারীবাদকে কারা ভয় পায়

  • 5:56 pm - February 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭৯ বার
নারীবাদের প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে নারীবাদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রক্ষণশীল ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো বারবার নারীবাদী আন্দোলনকে ‘পশ্চিমা এজেন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করছে এবং একে পুরোপুরি বর্জনের দাবি তুলছে। তাদের বক্তব্য হলো, নারীবাদ আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি পশ্চিমা প্রভাব থেকে আমদানি করা একটি ধারণা।

এই অভিযোগ শুধু বাংলাদেশেই নয়, উপনিবেশ-পরবর্তী বহু দেশেই নারীবাদীরা একই ধরনের তকমার মুখোমুখি হন। যখন নারীরা নিজেদের সমাজের ভেতরে বিদ্যমান ক্ষতিকর প্রথা, বৈষম্য বা সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সেই প্রতিবাদকে ‘পশ্চিমা মানসিকতা’ বা ‘পশ্চিমায়িত চিন্তা’ বলে খারিজ করে দেয়। তাদের যুক্তি হলো, নিজের সংস্কৃতির সমালোচনা করা মানেই উপনিবেশিক চিন্তাকে ধারণ করা।

এই যুক্তির পেছনে কাজ করে একটি কঠোর ‘আমরা বনাম তারা’ দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে ‘আমাদের সংস্কৃতি’কে কল্পনা করা হয় সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ, প্রাচীন ও হুমকির মুখে থাকা একটি সত্তা হিসেবে। আর ‘তাদের সংস্কৃতি’কে দেখানো হয় আগ্রাসী ও ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে। এই দ্বিবিভাজন নারীবাদীদের জন্য নিজেদের সমাজের ভেতরের নিপীড়নমূলক রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলার জায়গা সংকুচিত করে দেয়।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার’ প্রচেষ্টা বলে মনে হতে পারে। আমাদের উপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে এমন অবস্থান অনেকের কাছে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্যও মনে হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই ‘দেশীয় বনাম পশ্চিমা সংস্কৃতি’ বিভাজন নিজেই একটি উপনিবেশিক চিন্তার ফল। এটি উপনিবেশিক যুক্তিকে প্রতিহত না করে বরং নতুন করে পুনরুৎপাদন করে।

নারীবাদী গবেষক উমা নারায়ণ দেখিয়েছেন, এই বিভাজনের শিকড় রয়েছে উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে। উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অনেক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে পশ্চিমের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে। পশ্চিমা মূল্যবোধকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে তারা একটি ‘অকলুষিত’, ‘খাঁটি’ দেশীয় সংস্কৃতির ধারণা দাঁড় করায়। এটি ছিল উপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা স্থানীয় সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করার প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু এখানেই রয়েছে এক বড় ধরনের বিদ্রূপ। উপনিবেশকারীরাই প্রথম এই সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করেছিল, নিজেদের ‘উন্নত সভ্যতা’র দাবিতে। পরে উপনিবেশবিরোধীরা সেই শ্রেণিবিন্যাস উল্টে দিলেও একই কাঠামো ধরে রাখে। দুই পক্ষই রাজনৈতিক কারণে অপর সংস্কৃতিকে ‘অন্য’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। ফলে সংস্কৃতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা বাইরের প্রভাব থেকে আলাদা ও স্থির একটি সত্তা, যদিও বাস্তবে সংস্কৃতি সবসময়ই তুলনা, আদান-প্রদান ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদ উমা চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের বহু ‘প্রাচীন ঐতিহ্য’ আসলে উপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী বয়ানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে। একইভাবে, বহু তথাকথিত ‘প্রাচীন ইংরেজ ঐতিহ্য’ উনিশ শতকের শেষভাগে নতুন করে তৈরি হয়েছে।

উপনিবেশিক শক্তিগুলো নিজেদের আধিপত্যকে বৈধতা দিতে স্বাধীনতা, অগ্রগতি ও সমতার কথা বলত। তারা দাবি করত, উপনিবেশিত সমাজগুলোকে ‘পিছিয়ে পড়া’ অবস্থা থেকে বের করে আনতেই এই শাসন দরকার। অথচ একই সময়ে পশ্চিমেই নারীরা রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, দাসপ্রথা চালু ছিল এবং উপনিবেশিক শোষণ অব্যাহত ছিল।

অন্যদিকে, উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজেদের সংস্কৃতিকে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ দাবি করে সামাজিক পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। তারা উপেক্ষা করেন সেইসব প্রথা, যেগুলো নারীদের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা চালায়। যৌতুক হত্যা, বাল্যবিয়ে, সতীদাহ, সম্মান হত্যার মতো প্রথাগুলোকে ‘সংস্কৃতি’র নামে আড়াল করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে নারীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠে। উপনিবেশিক শাসন নিজেদের কর্তৃত্বকে বৈধতা দিতে পারিবারিক পিতৃতন্ত্রের ধারণা ব্যবহার করে। ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তায় যেমন পরিবারে বাবার কর্তৃত্বকে সমাজে রাজাদের কর্তৃত্বের সঙ্গে তুলনা করা হতো, তেমনি উপনিবেশিক শক্তিরা নিজেদের উপস্থাপন করত ‘অপরিণত’ জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হিসেবে।

উপনিবেশিক বয়ানে উপনিবেশিত পুরুষদের দেখানো হতো অযৌক্তিক ও আত্মনিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে, আর নারীদের দেখানো হতো স্থানীয় পশ্চাৎপদ প্রথার শিকার হিসেবে, যাদের ‘রক্ষা’ দরকার। এই যুক্তির মধ্য দিয়েই উপনিবেশিক হস্তক্ষেপকে নৈতিকতা দেওয়া হতো।

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলো যদিও এই শাসনের বিরোধিতা করে, তবু তারাও রাজনৈতিক মুক্তিকে মূলত পুরুষত্বের ভাষায় ব্যাখ্যা করে। স্বাধীনতাকে দেখানো হয় পুরুষত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবে। নারীরা এই বয়ানে প্রায় অনুপস্থিত থাকে, অথবা থাকে প্রতীক হিসেবে। তারা হয়ে ওঠে জাতির সম্মান ও সংস্কৃতির বাহক, যাদের রক্ষা করা পুরুষদের দায়িত্ব।

এই জাতীয়তাবাদী কাঠামোতে নারীরা নাগরিক হিসেবে নয়, বরং ‘জাতীয় পরিবারের’ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পান। তাদের প্রধান ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় ভবিষ্যৎ নাগরিক জন্ম দেওয়া, ভাষা ও ঐতিহ্য বহন করা এবং জাতির নৈতিকতার প্রতীক হওয়া। এর ফল হিসেবে নারীদের জীবনযাপন, পোশাক, আচরণ নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। নারীদের শরীরই হয়ে ওঠে ‘সংস্কৃতি রক্ষার’ প্রধান ক্ষেত্র।

এই অবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন নারীরাই। অথচ এই পুরো বিতর্কে নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠ প্রায় অদৃশ্য থাকে। ‘আমাদের সংস্কৃতি বনাম তাদের সংস্কৃতি’ এই লড়াই মূলত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যেখানে নারীদের ব্যবহার করা হয় হাতিয়ার হিসেবে।

বাংলাদেশে নারীবাদকে ‘পশ্চিমা এজেন্ডা’ বলার প্রবণতা এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ। অথচ বাংলাদেশের নারীবাদ গড়ে উঠেছে একেবারে স্থানীয় বাস্তবতা থেকে। যৌতুক সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, এসিড হামলা, সালিশ ও ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত শাস্তি, মেয়েদের শিক্ষা ও উত্তরাধিকারে বৈষম্য, আদিবাসী নারীদের ওপর নিপীড়ন এসবই ছিল এ দেশের নারীবাদী আন্দোলনের ভিত্তি।

১৯৯৩ সালে গ্রামীণ নারী নূরজাহানকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অভিযোগে সালিশের মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালে ১৪ বছরের কিশোরী নূরুন্নাহারকে ৩৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। এসব ঘটনা কোনো ‘পশ্চিমা ধারণা’ থেকে আসেনি। এগুলো আমাদের সমাজের বাস্তবতা।

পশ্চিমা দেশগুলোতেও নারীরা দীর্ঘদিন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে লড়াই করেছেন। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশের নারীরা যখন নিজেদের জীবনের সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, সেটিকে অনুকরণ বলা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

নারীবাদ অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদীরাই ‘হোয়াইট ফেমিনিজম’-এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পোস্টারে অবমাননাকর শব্দ লেখা হচ্ছে, কিংবা প্রকাশ্য সমাবেশে নারীবাদী নেত্রীদের গালিগালাজ করা হচ্ছে, তা কোনো মতাদর্শিক সমালোচনা নয়। এটি ভয় দেখানো এবং চুপ করিয়ে দেওয়ার কৌশল।

এই প্রতিক্রিয়া আসলে সেই পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক রাগেরই বহিঃপ্রকাশ, যা একসময় নারীদের ভোটাধিকার, শিক্ষা ও সমান নাগরিকত্বের বিরোধিতা করেছিল। ইতিহাসজুড়ে যে কোনো নারী বা চিন্তাধারা এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তাকেই হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে।

তাই বাংলাদেশে নারীবাদকে বোঝার জন্য এটিকে ‘পশ্চিমা বনাম দেশীয়’ বিতর্কে আটকে না রেখে দেখতে হবে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ক্ষমতার সম্পর্কের ভেতরে। নারীবাদ এখানে কোনো আমদানি করা ধারণা নয়। এটি এই সমাজের ভেতর থেকেই জন্ম নেওয়া একটি ন্যায়বিচারমূলক সংগ্রাম।

 

লেখকঃ নাবিলা তাসনিম অনন্যা, দ্য ডেইলি স্টার।

সূত্রঃ এশিয়ান নিউজ নেটওয়ার্ক; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

জয়পুরহাটে ধান কাটা নিয়ে তর্কের জেরে দিনমজুরকে হত্যা

মেলবোর্ন, ৭ জুন- জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় ধান কাটা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জেরে শ্যামল চন্দ্র মালী (৫০) নামে এক দিনমজুর নিহত হয়েছেন। শনিবার (৬ জুন) বিকেলে উপজেলার কাশিড়া…

আগস্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল, অক্টোবরের শেষভাগে শুরু হতে পারে ভোটগ্রহণ

মেলবোর্ন, ৭ জুন- দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্ট মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে এবং…

লেবাননে নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ মধ‌্যরা‌তে দেশে পৌঁছাবে

মেলবোর্ন, ৭ জুন- লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি কর্মীর মরদেহ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশে ফিরছে। শনিবার (৬ জুন) দিবাগত রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে…

রাত পোহালেই বিসিবি নির্বাচন

মেলবোর্ন, ৭ জুন- বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামীকাল রোববার। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ…

রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ

মেলবোর্ন, ৭ জুন- রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় আজ রোববার ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের…

ভারতের রাজনীতিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কেন আলোচনায়?

মেলবোর্ন, ৭ জুন- ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি অদ্ভুত নামের অনলাইন আন্দোলন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল না হয়েও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au