চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি- জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের উদ্দেশে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সাধারণ পরিবারকে সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং নিত্যপণ্যের দামে স্বস্তি দেওয়ার মতো ঘোষণা এসবের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা মানুষের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয় শোনালেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর সঙ্গে কোনো বিস্তারিত আর্থিক পরিকল্পনা নেই। কীভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে, কত সময় লাগবে, অতিরিক্ত কত ব্যয় হবে বা কর ছাড় দিলে রাজস্ব কতটা কমবে, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণের ওপর এর প্রভাব কী হবে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনুপস্থিত। নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামোর অভাবে এসব ঘোষণা বাস্তবে কেবল সামগ্রিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
এই আর্থিক বিশদ না থাকা একাধিক কারণে উদ্বেগজনক। নির্বাচনের পর গঠিত সরকারকে এমন এক সময়ে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, যখন অর্থনীতির সক্ষমতা ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। দুর্বল রাজস্ব আদায়, বাড়তে থাকা সরকারি দায় এবং সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকির কারণে সরকারের নীতিগত সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অথচ উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো খাতে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ছেই। এই অবস্থায় নতুন সরকার কীভাবে রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনবে, সেটিই নির্বাচনের পর দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের অত্যন্ত নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত। বর্তমানে দেশের কর আদায়ের সক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে নিচের স্তরে নেমে এসেছে, যা বিশ্বব্যাপীও খুবই দুর্বল অবস্থান নির্দেশ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়ে। এটি রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে আর্থিক নীতি কৌশলগত হওয়ার বদলে ক্রমেই পরিস্থিতিনির্ভর হয়ে উঠছে।
আগামী বছরগুলোতে সরকারি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন অনেক আর্থিক দায় রয়েছে, যেগুলো আর বিলম্বিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা বিল ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল রাখতে সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের নীতিনির্ধারণের পরিসরকে আরও সীমিত করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি। এই কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা থাকলেও, এর আর্থিক প্রভাব হবে বিপুল। যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হতে পারে এবং বাজেট ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
দেশীয় চাপের পাশাপাশি বৈদেশিক ঝুঁকিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের তুলনায় উন্নতি হলেও আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রবাসী আয় ১৭ শতাংশের বেশি বাড়লেও, এই প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কম। রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই ঋণ পরিশোধ আরও বড় চাপ হয়ে উঠবে।
রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের ওপরও বেশি নির্ভর করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি মিললেও, অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের সুদহারও বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ বেড়েছে ৩২ শতাংশের বেশি।
সরকারি ব্যয়ের দক্ষতাও বড় একটি প্রশ্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ সীমিত হলেও বাস্তবায়নের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে অপচয় এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘদিনের তহবিল সংকট একসঙ্গে বিদ্যমান। করমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি, এমপি ও মন্ত্রীদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের মতো ব্যয় জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব, স্কুলে শ্রেণিকক্ষের সংকট এবং স্বল্পমূল্যের পণ্যের জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, তখন এসব ব্যয় অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য ব্যয় সংকোচন বা মিতব্যয়িতা একটি প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া জরুরি। ব্যয়ের ওপর জবাবদিহি বাড়াতে সংসদীয় তদারকি জোরদার করা এবং বাজেট বাস্তবায়নের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বার্ষিক বাজেটের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনাও গুরুত্ব পেতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ দায় ও ঝুঁকি আগেভাগেই বিবেচনায় আনা যায়।
সব মিলিয়ে, পরবর্তী সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে এই জটিল আর্থিক রূপান্তর কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া যায় তার ওপর। শুধু বাজেটের হিসাব মেলানোই নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে নতুন করে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি। ন্যায্য ও কার্যকর কর ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনে সরাসরি সুফল আনে এমন সরকারি ব্যয়ই পারে সেই আস্থা ও বৈধতা পুনরুদ্ধার করতে।
লেখকঃ ফাহমিদা খাতুন, ডেইলি স্টার।
সূত্রঃ এশিয়ান নিউজ নেটওয়ার্ক; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au