চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর গঠিত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেখা ভয় ও দমননীতির কিছু দিক, যেমন ব্যাপক গুমের ঘটনা, কমে এসেছে, তবু নতুন সরকারের আমলেও রাজনৈতিক দমন, নির্বিচার আটক এবং সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার হাজার হাজার মানুষকে রাজনৈতিক বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করে নির্বিচারে আটক করেছে এবং মে মাসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই রায়ে বলা হয়, আন্দোলন দমনের নামে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সহিংস গণআক্রমণ। এর মধ্যে রয়েছে নারী অধিকার এবং সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামী জনগোষ্ঠীর বিরোধী ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠী। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।
অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তবে এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকার খুবই সীমিত অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশ পুলিশের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, আন্দোলন দমনে ভূমিকার অভিযোগে মাত্র ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ট্রাইব্যুনাল আগে মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। নভেম্বর মাসে ট্রাইব্যুনাল অনুপস্থিতিতে বিচার করে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই মামলায় এক সাবেক পুলিশপ্রধান, যিনি বর্তমানে হেফাজতে আছেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য দিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এই ট্রাইব্যুনালে ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সরকার আইন সংশোধন করে কিছু উন্নতি আনলেও এখনো সেখানে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে। কমিশনের সদস্যরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণ নষ্ট করেছেন, সহযোগিতা সীমিত করেছেন এবং দায়ীদের জবাবদিহির পথে বাধা সৃষ্টি করছেন। অক্টোবরে গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্কার কার্যক্রমও থমকে আছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে ফেলেছিলেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার ও সংবিধান সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করে। পরে ইউনূসের নেতৃত্বে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের অভাবে খুব কম সংস্কারই বাস্তবায়িত হয়েছে। আগস্টে জুলাই ঘোষণা এবং অক্টোবরে জুলাই সনদ প্রকাশ করা হয়। নভেম্বর মাসে জানানো হয়, নির্বাচনের সময় সংবিধান সংস্কার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বিচার আটক ও গণগ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আটক, যা আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপকভাবে চলছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ও সমর্থককে বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত জামিন দেওয়া হচ্ছে না। তাদের মধ্যে অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী, সংগীতশিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ছাত্র আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের পর ডেভিল হান্ট নামে অভিযানে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নারী ও কিশোরীদের অধিকার পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ব্যাপকভাবে চলমান রয়েছে এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই। এপ্রিল মাসে নারীর অধিকার সুরক্ষায় গঠিত কমিশন বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, সমান অভিভাবকত্ব অধিকার ও উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের সুপারিশ করে। এর প্রতিবাদে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের প্রায় ২০ হাজার সমর্থক বিক্ষোভ করে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়েও প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ না থাকলেও সরকার এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শিবিরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের সহিংসতা, ধর্ষণ, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তা সংকুচিত হয়েছে, যা অপুষ্টি ও রোগবালাই বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই মাসে রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামেও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রসঙ্গে বলা হয়, বৈষম্যমূলক সম্পদ বণ্টনের কারণে ২০২৪ সালের আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। ২০২৪ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কঠিন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার ফলে দলটির সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন বক্তব্য বন্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা হলেও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পূর্ণ সুরক্ষা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সমকামী সম্পর্ক এখনো ফৌজদারি অপরাধ এবং যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্য রোধে কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। এলজিবিটি জনগোষ্ঠী ও অধিকারকর্মীরা ক্রমবর্ধমান হুমকি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মুখে পড়ছেন, যার সঙ্গে রাজনীতিকদের ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au