মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার
মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে শ্যামল গাইন (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার…
মেলবোর্ন, ৫ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ যোগ্য ভোটার তাদের প্রতিনিধি বেছে নেবেন। একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটি প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তারও একটি পরীক্ষাক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক ২০১৩ সালের মিসরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানছেন। যদিও দুটি দেশের বাস্তবতা এক নয়, তবু কিছু মিল ও সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার একই সঙ্গে এমন কিছু পার্থক্যও রয়েছে, যা দেখায় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়নি।
২০১৩ সালে মিসরে অভ্যুত্থানের আগে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির মিল থাকলেও মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের পর সেনাবাহিনী সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি এবং মিসরের মতো দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতিহাসও নেই। গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিযোগিতামূলক, নাগরিক সমাজ সক্রিয় এবং জনগণের মধ্যে নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি দৃঢ় আগ্রহ রয়েছে। আঞ্চলিক আদর্শিক দ্বন্দ্বও মিসরের মতো তীব্র নয়।
তবে এসব ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থার ঘাটতি ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
মিসরের গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছিল ভোটারদের রায়ের কারণে নয়, বরং কারণ ছিল রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসামরিক শাসন মেনে নিতে অনীহা। সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘ডিপ স্টেট’ নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়।
বাংলাদেশেও সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে ক্ষমতায় না থাকলেও পর্দার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে সেনানিবাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আশ্রয়, দীর্ঘ সময় ধরে দেশজুড়ে সেনা মোতায়েন এবং বাড়তি আইনি ক্ষমতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতা, রাজনীতিকৃ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয়তা এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে নির্বাচনে জয়ী শক্তিই যে শেষ পর্যন্ত কার্যকরভাবে শাসন করতে পারবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে রাজনীতির মূলধারা থেকে বাদ দেওয়ার পরই ব্যবস্থাটি ভারসাম্য হারায়। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে তাদের বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি নির্বাচনের বৈধতার জন্য বড় হুমকি। শেখ হাসিনার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্ক কষে অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ হয়তো বিএনপিকে ভোট দিতে পারে। তবু বড় একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যালটের বাইরে রাখার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।
২০১২-১৩ সালে মিসরের গভীর রাজনৈতিক বিভাজন আপসের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সেই শূন্যতায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও বিরোধী শিবির বিভক্ত। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যের অভাব স্পষ্ট।
তরুণ প্রজন্ম নতুন সংবিধান, বিচারিক স্বাধীনতা, বংশানুক্রমিক রাজনীতির অবসান এবং বৈষম্যহীন সমাজের দাবি তুলছে। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে। বিএনপির বিরুদ্ধে পুরোনো চর্চা থেকে পুরোপুরি সরে না আসার অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মিসরের অভিজ্ঞতা দেখায়, জনগণের আস্থা হারালে নির্বাচনও গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে না। বাংলাদেশেও ভোট কারচুপি, বয়কট ও অনিয়মের অতীত ইতিহাস জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং তা ঘিরে বিতর্ক জনআস্থাকে আরও নড়বড়ে করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
মিসরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় যখন সেটিকে ব্যর্থ করার জন্যই পরিবেশ তৈরি করা হয়। নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ছাড়া ভোট অর্থবহ থাকে না।
বাংলাদেশ আজ দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বর্জন ও ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তবু এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যদি সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগোয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। আন্তর্জাতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের মানুষই। প্রশ্ন শুধু একটাই, ভোটের ফলকে সবাই কি সত্যিকার অর্থে মেনে নিতে প্রস্তুত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au