‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ৬ ফেব্রুয়ারি- ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীকে গত ২৭ ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে সাদা পোশাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি। আটক করার একদিন পর ২০২২ সালে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ওই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, বিএনপির একটি অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন। তবে শংকর মুখার্জীর পরিবারের দাবি, বাজার এলাকায় থাকা তাদের জমি ও খামারের দখল নিতেই পরিকল্পিতভাবে এই মামলা দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ২০২২ সালে যখন মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল, তখন সেখানে শংকর মুখার্জীর নাম ছিল না।
শুধু শংকর মুখার্জীর ঘটনাই নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটক যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় পরিণত হয়েছে, তা উঠে এসেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬-এ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থককে সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জোরপূর্বক গুমসহ ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে আটক করার অভিযোগ রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।
আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখার সুযোগ নেই। তবুও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ার পেছনে মব সহিংসতার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে জিম্মি করা এবং সরকারের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শংকর মুখার্জীর মামলাটি পরিচালনা করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি জানান, মামলাটি মিথ্যা উল্লেখ করে আদালতে দুই দফা জামিন আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। মনজিল মোরসেদ বলেন, বাংলাদেশের আইনে বিচার ছাড়া কাউকে এক মুহূর্তও আটক রাখার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, তবে ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে তাকে আদালতে হাজির করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মামলা না থাকলে বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া কাউকে আটক করার কোনো ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই। অথচ বাস্তবে এই বিধান অহরহ লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা আগেও হয়েছে, তবে বর্তমানে তা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ ধারায় বলা আছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে এবং তাকে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করাও বাধ্যতামূলক। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কাউকে আটক রাখা যাবে না। বিদেশি শত্রু বা নিবর্তনমূলক আইনের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও, সেখানেও ছয় মাসের বেশি আটক রাখতে হলে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়।
সংবিধানের ১০২ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় আদালতকে আইনের বাইরে আটক ব্যক্তির মুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবুও বাস্তবে গ্রেপ্তারের পর জামিন পাওয়ার অধিকার নিয়মিতভাবে ভঙ্গ হচ্ছে বলে অভিযোগ আইনজীবীদের।
এই পরিস্থিতিতে অনেকের মত, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বিচার আটক ও হয়রানির মাত্রা আরও বেড়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, সংবিধান সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের হলেও, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আদালত যথেষ্ট সক্রিয় ভূমিকা রাখছে না।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, হাজার হাজার মামলা হলেও খুব অল্পসংখ্যক মামলাই শুনানির তালিকায় আসে। ফলে বিচার বিভাগের ওপর যে দায়িত্ব ছিল, সেটি কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছে না। এর পেছনে মব সহিংসতা এবং সরকারের হস্তক্ষেপকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
একই অভিযোগ তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক বিচারককে বরখাস্ত করার ঘটনায় বিচারকদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে ছোট ঘটনায়ও বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকে আটক করা হতো, বর্তমান সময়ে এসে সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা মামলায় নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
শাহদীন মালিকের মতে, পুলিশের দায়িত্ব ছিল প্রাথমিকভাবে অভিযোগের যৌক্তিকতা যাচাই করা। কিন্তু তা না করে অর্থহীনভাবে অসংখ্য মানুষের নাম মামলায় যুক্ত করা হচ্ছে, যা এক ধরনের মামলা বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। পাঁচ আগস্টের পর মব সন্ত্রাসের যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কাউকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে, আর পুলিশ মবের চাপে মামলা নিতে বা আটক করতে বাধ্য হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নারী ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে থাকা গোষ্ঠীর মব সহিংসতার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানের আওতায় অন্তত আট হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনেও বহু মানুষ আটক হয়ে থাকতে পারেন। গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে একটি রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন। এরপর পুলিশ শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করে এবং আট হাজার ৪০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যার বেশিরভাগই অজ্ঞাতনামা।
যদিও সরকার এসব ঘটনাকে গণগ্রেপ্তার হিসেবে মানতে নারাজ। তবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে নির্যাতনের ফলে। রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় আট হাজার মানুষ এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৮১ জন।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au