সাংবাদিক রেজানুরের গ্রেফতারে কিউআরএস’র উদ্বেগ
মেলবোর্ন, ২২ জুন- স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক ও দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামের গ্রেফতার…
মেলবোর্ন, ৬ ফেব্রুয়ারি- লন্ডনের পূর্বাঞ্চল হোয়াইটচ্যাপেল রোডের কাসাব্লাঙ্কা ক্যাফেতে দুপুরের ভিড়। কাচঘেরা কাউন্টারের পেছনে সিঙ্গারা, বিরিয়ানি আর পাশ্চাত্য নাশতার খাবার পাশাপাশি সাজানো। কেউ অফিসের বিরতিতে দ্রুত খেয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার ইস্ট লন্ডন মসজিদে নামাজের আগে গল্পে মেতে আছেন। এই ক্যাফেতেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
ক্যাফের মাঝখানে বসে আদা ও মধু চা হাতে নিয়ে কথা বলছিলেন খালেদ নূর। তিনি পেশায় ব্যারিস্টার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের ঘোষণা আসার পর থেকেই ব্রিটেনে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থামছে না। তাঁর মতে, বহু বছর ধরে প্রবাসীরা ভোটাধিকার চেয়েছেন। এবার প্রথমবার সেই সুযোগ এসেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপসারণের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রায় দুই দশক পর এটিই এমন একটি নির্বাচন, যেখানে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের বছরগুলোতে একতরফা নির্বাচন, বিরোধীদের বর্জন এবং দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশের ভেতরে ও বাইরে বহু মানুষ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বে আবর্তিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও একই সঙ্গে কর্তৃত্ববাদ ও দমনের অভিযোগও বেড়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা বিএনপি এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানকে কেউ কেউ একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছেন, আবার সমালোচকেরা তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরছেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এই নির্বাচন বিএনপির জন্য আরও আবেগঘন হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছে। এমন রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেই প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার পেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাত মিলিয়নের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি ইতিমধ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন। এটি মোট ভোটারের প্রায় পাঁচ শতাংশ। ধারণা করা হয়, বিশ্বে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে বসবাস করেন।
তবে যুক্তরাজ্যে চিত্রটি ভিন্ন। সেখানে মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি বাংলাদেশি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। অথচ ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ছয় লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন। টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশই বাংলাদেশি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ব্যবধানের কারণ হলো পরিচয় ও নাগরিকত্বের পার্থক্য। অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও তাঁদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র বা নাগরিকত্বের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। ফলে তাঁরা ভোট দিতে পারছেন না।
কিছু নির্বাচনী এলাকায় প্রবাসী ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে নির্বাচন কমিশনের ধারণা। ফলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলে এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাস্তবে ভোট দেওয়া সহজ নয়। ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অতিরিক্ত ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। অনেকের কাছে এটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ মনে হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের জন্য এই প্রক্রিয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ দেখাননি। তাঁদের একজন বলেন, বাংলাদেশে কী হচ্ছে, তা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। ব্রিটেনের রাজনীতি তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদ নূর বলেন, তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই অনীহা স্বাভাবিক। অন্যদিকে সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। কারণ সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা বেশিরভাগই একা কাজ করেন এবং পরিবারের সঙ্গে দেশের সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন।
ইস্ট লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাংলা সংলাপ’-এর সম্পাদক মোশাহিদ আলী জানান, ভোটাধিকার নিয়ে আগ্রহ থাকলেও প্রক্রিয়ার জটিলতা অনেককে নিরুৎসাহিত করেছে। কেউ কেউ ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সম্পর্কে দেরিতে জেনেছেন। কেউ আবার সময়মতো জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি।
অনেকে আবার ভোট দিতে পারলেও ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচন বর্জন করেছেন। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এই নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে সবার মনোভাব এক নয়। আইল অব ডগসের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বসে চা খেতে খেতে আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচন প্রসঙ্গ। কেউ বলছেন, বহু বছর পর ভোটের গুরুত্ব আবার ফিরে এসেছে। কেউ আবার সন্দিহান, নির্বাচন আদৌ পরিবর্তন আনবে কি না।
জাহানারা বেগম নামের এক নারী জানান, তিনি বহু বছর পর এবার ভোট দিতে পেরে খুশি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এই নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তাঁর মেয়ে নার্গিস আখতার বলেন, শুধু নির্বাচন হলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।
সব মিলিয়ে ব্রিটেনে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে ভোট নিয়ে অনুভূতি মিশ্র। কারও কাছে এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের মুহূর্ত, আবার কারও কাছে এটি দূরের ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। তবুও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au