মেলবোর্ন ৭ ফেব্রুয়ারি- আকস্মিক জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে থাইল্যান্ডে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামীকাল রোববারের ভোটকে ঘিরে বাজির দান বড় হলেও ভোটারদের মধ্যে স্পষ্ট উত্তেজনার বদলে দেখা যাচ্ছে গভীর দ্বিধা ও সতর্কতা।
গত তিন বছরে দেশটিতে তিনজন প্রধানমন্ত্রী বদলেছেন। কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চলতি বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মাত্র ২ শতাংশ। এর সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা বহু বিলিয়ন ডলারের অনলাইন প্রতারণা চক্র থাই অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ব্যাংককের জনপ্রিয় ক্লং লাট মায়োম ভাসমান বাজারে কথা হয় অবসরপ্রাপ্ত কৃষক কানোনেংনিতের সঙ্গে। দুপুরের খাবারের ফাঁকে তিনি বলেন, “এখনো ঠিক করতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন। তাঁর ভাষায়, “সব দলই নীতির কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে কে কী করবে, তা বোঝা কঠিন।”
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হাত ইয়াইয়ের বাসিন্দা চানচাই সেউংও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান। তিনি বলেন, রাজনীতিকদের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। “তারা প্রতিশ্রুতি দেয়, আশা জাগায়। শেষ পর্যন্ত কিছুই বদলায় না।”
এই হতাশার পেছনে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস বড় ভূমিকা রাখছে। গত ২৫ বছরে মাত্র একটি নির্বাচিত সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি সরকারগুলো সামরিক অভ্যুত্থান বা সাংবিধানিক আদালতের রায়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই দুই শক্তির ওপর দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণশীল অভিজাতদের প্রভাব রয়েছে।
২০২৩ সালের নির্বাচনে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ স্পষ্ট হয়। রেকর্ড ভোট পেয়ে প্রগতিশীল মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি সংসদে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কমানো ও রাজতন্ত্র সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা লেসে-মাজেস্তে আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় দলটি।
কিন্তু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সেনা-নিযুক্ত সিনেট দলটির নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেয়নি। পরে সাংবিধানিক আদালতের রায়ে দলটিই ভেঙে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ভোটারের আশা ভেঙে পড়ে।
মুভ ফরওয়ার্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা থানাথর্ন জুয়াংরুয়াংকিত বলেন, একটি স্বাভাবিক গণতন্ত্রে নির্বাচনের ফল আর সরকার গঠনের মধ্যে মিল থাকার কথা। “মানুষ হতাশ হয়েছিল, কারণ তারা যে দলকে ভোট দিয়েছিল, সেই দল জিতেও ক্ষমতায় আসতে পারেনি,” বলেন তিনি।
এবারের নির্বাচনে মুভ ফরওয়ার্ড নতুন নামে ‘পিপলস পার্টি’ হিসেবে মাঠে নেমেছে। জনমত জরিপে দলটি এগিয়ে থাকলেও সামনে বাধা কম নয়। দলের ৪৪ জন সদস্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি বা আজীবন নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে।
হাত ইয়াইয়ে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হওয়া সুপাত হাসুওয়ান্নাকিত সেই তালিকায় আছেন। দীর্ঘদিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর তিনি রাজনীতিতে আসেন ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের আশায়। তবে ভোটের ঠিক আগে তাঁর বিরুদ্ধে কোভিড-১৯ পরীক্ষার কিট কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
সুপাত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মহামারির চরম সময়ে প্রয়োজনের অনিশ্চয়তার কারণেই ছোট ছোট অর্ডার দিতে হয়েছিল।
তিনি অভিযোগের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। আপিল খারিজ হলে নির্বাচনে জয়ী হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারবেন না। “আমি জানতাম, এমনটা হবে। এটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে থামানোর চেষ্টা,” বলেন তিনি।
এই নির্বাচনে পিপলস পার্টির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রক্ষণশীল ভূমজাইথাই পার্টি। তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী অনুতিন চার্নভিরাকুল অভিযোগে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচন বিধি ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রগতিশীল দল নিজেরাই ঝুঁকি ডেকে এনেছে। তবে ভোটের আগে দ্রুত পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণে পিপলস পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো প্রতিপক্ষ নয়।
বরং তাদের নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে জন্ম নেওয়া গভীর সংশয়। দীর্ঘদিনের ভাঙা গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতায় ভোটাররা আবারও প্রশ্ন তুলছেন, তাদের ভোট আদৌ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।