বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের নেতা শফিকুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ ফেব্রুয়ারি- আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, কোন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি ফলাফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার। তারা ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদের জন্য ৩৫০ জন সদস্য নির্বাচন করবেন। একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ অনুমোদন বা বাতিলের বিষয়ে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। ওই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তার দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে দুটি বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যে। একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জামায়াতের জোটে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, যেটি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণদের দ্বারা গঠিত। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় এই দুটি জোটই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপি এবার নির্বাচনে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি। জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি মধ্য ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে যুক্ত ছিল।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপি দীর্ঘদিন দমন ও মামলার মুখে পড়ে। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় গৃহবন্দি করা হয়, যদিও ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর তিনি সব অভিযোগ থেকে খালাস পান। দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে দলের হাল ধরেন। দেশে ফিরে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার ও তরুণদের কর্মসংস্থানের কথা বলেন।
বিভিন্ন জরিপে বিএনপিকে এগিয়ে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রায় ৩৩ শতাংশ বলে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ফেরার পর বিএনপি সংগঠিত ও সতর্ক হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে জনসমর্থন বাড়িয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীও এবারের নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলটি ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। পরে ১৯৭৯ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বিএনপির সঙ্গে জোট করে জামায়াত ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখে।
তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০১৩ সালে দলটিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন ফিরিয়ে দিলে দলটি আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন শফিকুর রহমান।
জামায়াত এবারের নির্বাচনে নিজেদের পুনর্গঠন করেছে এবং নতুন জোট গড়েছে। প্রথমবারের মতো তারা একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা দলটির জন্য ব্যতিক্রমী ঘটনা। জরিপে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপির খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তবে দলটি ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় আইন বা নারীর অধিকার সংকুচিত হবে কি না, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে। জামায়াত এসব আশঙ্কা নাকচ করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি জামায়াত জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের হাত ধরে ২০২৫ সালে দলটি গঠিত হয়। নাহিদ ইসলাম এই দলের নেতা। দলটি দুর্নীতিমুক্ত শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলছে। তবে আর্থিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে বাধ্য হয়েছে, যা দলের ভেতরেও সমালোচনা ও ভাঙন তৈরি করেছে।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল, তবে এবার তারা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
নির্বাচনে সরাসরি অংশ না নিলেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ফলাফলে বড় প্রভাব রাখতে পারেন। একজন হলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট বাস্তবায়নে মনোযোগ দিচ্ছেন। এই সনদে দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, নির্বাচন সংস্কার ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। যদিও কেউ কেউ বলছেন, গণভোটের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেনাবাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে না থাকলেও নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন এবং নির্বাচন আয়োজনের সময়সীমা নিয়েও বক্তব্য দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা নির্বাচনের বাইরে থাকলেও পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাননি। তিনি ভারত থেকে নির্বাচনকে অবৈধ বলে সমালোচনা করছেন। তার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার নিষিদ্ধ হলেও বিষয়টি রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা এবার কাকে ভোট দেবেন, তা এখনও অনিশ্চিত এবং এই ভোটের দিকনির্দেশনা নির্বাচনের ফলকে বড়ভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনাবিহীন এবং আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড়। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন শক্তি, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং সেনাবাহিনীর অবস্থান মিলিয়ে এই নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ আল জাজিরা