ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ ফেব্রুয়ারি- রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাপনাকে একটি স্বতন্ত্র কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। রোববার আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেট আকারে অধ্যাদেশটি প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নামে একটি নতুন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলো।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিকভাবে যুক্ত থাকবে। তবে কলেজগুলোর স্বকীয়তা ও নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। খসড়া অধ্যাদেশে যেখানে সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করার প্রস্তাব ছিল, চূড়ান্ত অধ্যাদেশে সেই কাঠামো থেকে সরে এসে অধিভুক্তিমূলক ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সাতটি কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদায়নের দায়িত্ব থাকবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ওপর। কলেজগুলো সংযুক্ত কলেজ হিসেবে থাকলেও তাদের বিদ্যমান অবকাঠামো, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিত থাকবে।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্বতন্ত্র স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। তবে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভাড়া করা ভবন ও জায়গা ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকায় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হবে এবং এটি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে আচার্য, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল থাকবে। সংযুক্ত কলেজগুলোর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে অধ্যক্ষরা দায়িত্ব পালন করবেন, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হবেন উপাচার্য। কলেজের শিক্ষকরা ‘কলেজ শিক্ষক’ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু ‘শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিত হবেন বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে থাকবে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাদান ও গবেষণার ব্যবস্থা করা, আধুনিক প্রযুক্তি ও জাতীয় অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোর্স প্রণয়ন, ডিগ্রি ও সনদ প্রদান এবং প্রয়োজনে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান। একই সঙ্গে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক, সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও এমিরেটাস অধ্যাপকসহ বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের ক্ষমতাও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে।
সংযুক্ত কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষাদান ও গবেষণা কার্যক্রম ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, পরীক্ষাগার ও কর্মশালা কার্যক্রম, টিউটোরিয়াল, ভার্চুয়াল শিক্ষা এবং অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল।
এই অধ্যাদেশ জারির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রেক্ষাপট। এক সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা সাতটি কলেজকে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই দাবি আরও জোরালো হয়।
পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়ন করে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোর অধিভুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মাধ্যমে কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করা হয়। তবে খসড়ায় প্রস্তাবিত স্কুলিং কাঠামোর বিরোধিতা করেন কলেজগুলোর শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা। তাদের দাবি ছিল, কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে অধিভুক্তিমূলক কাঠামোতেই বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করতে হবে। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের একাংশ দ্রুত অধ্যাদেশ জারির দাবিতে আন্দোলনে নামেন।
সবশেষে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দেয়। দুই সপ্তাহ পর তা গেজেট আকারে প্রকাশের মাধ্যমে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি চূড়ান্ত হলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সাত কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পথে এগোলেন।