সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া (অব.) এই সাবেক সেনাপ্রধানকে ঘিরে ক্ষোভের খোলা চিঠি
মেলবোর্ন, ১০ ফেব্রুয়ারি: শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। পুরো মেয়াদে দায়িত্ব শেষে তিনি সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি হঠাৎ করে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেন এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা কিছু সদস্যের অসন্তোষ উসকে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সরকার পতনের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনা, তার সরকার এবং সেনাবাহিনীর কয়েকজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম সংক্রান্ত একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেনাবাহিনী, র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা নিয়ে একপাক্ষিক বক্তব্য দেন এবং একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
তার এসব বক্তব্য ইতোমধ্যেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতায় থাকার সময় কিংবা অবসরে যাওয়ার পর এতদিন তিনি কেন এসব বিষয়ে নীরব ছিলেন? আজ হঠাৎ করে তিনি কার বা কাদের স্বার্থে এসব অভিযোগ সামনে আনছেন? এই প্রশ্নগুলো থেকেই কেউ কেউ ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে সুবিধাবাদী, এমনকি ভণ্ড ও ক্ষমতালোভী বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা লেখাটা শুরু করেছেন এভাবে…
সাবেক সেনাপ্রধানের বক্তব্য ও আমার কমিশন সারেন্ডার করা প্রসঙ্গে:
একটি খোলা চিঠি শ্রদ্ধেয় ইকবাল করিম স্যার, সশ্রদ্ধ সালাম নিবেন।
ক্ষমা করবেন—এই চিঠিটি লিখতে গিয়ে আমার কলম বারবার আটকে যাচ্ছিল। কারণ আমি আপনাকে কখনো একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখিনি। আপনি ছিলেন আমার কাছে একটি প্রতিষ্ঠান, একটি বিশ্বাস, একটি আদর্শ। স্যার তবু আজ, বুকভরা আবেগ নিয়ে একটি অপ্রিয় প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে বাধ্য হচ্ছি— চিফ প্রসিকিউটর তাজুল সাহেবের কাছে দেয়া আজকের এই “সত্যগুলো” প্রকাশ করতে আপনাকে ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হলো কেন স্যার? শুরুতেই ক্লিয়ার করে নিচ্ছি যে আমি রেবে চাকরি করিনি। আলহামদুলিল্লাহ সেই দুর্ভাগ্য আমার কপালে আসেনি। আপনি ২০১৫ সালে অবসরে গেছেন। তার আগেও, আপনার সময়ে—দেশে অন্যায়, দুর্নীতি, গুম, খুনের অভিযোগ উঠেছে। জেনে-শুনেও কেন তখন আপনি নীরব ছিলেন? কেন তখন জাতির সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বললেন না? আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে—সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো মাধ্যমে—আপনার এই বক্তব্য আমরা শুনিনি। আপনার জন্য সেনাপ্রধানের পদটি ধরে রাখা কি পুরা সেনাবাহিনীকে রক্ষা করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল? নাকি শেখ হাসিনা সরকারকে তোষামতি করে আপনি জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ হতে চেয়েছিলেন? এমন গুজব আমরা প্রায়ই শুনতাম আগে। স্যার, আমি নিজে একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
২০১৪ সালের নির্বাচনে আমি মাঠে ছিলাম। সে সময় আমাদের মধ্যে একটি গুজব ছড়ায়—সেনাবাহিনী যদি কেন্দ্রে কেন্দ্রে দৃশ্যমান থাকে, তাহলে ভোট জালিয়াতি করা কঠিন হবে। এরপর সত্যি সত্যি আমাদের কাছে আদেশ আসে—সেনাবাহিনী যেন ইলেকশনের ৭২ ঘন্টা আগে থেকে ক্যাম্পের ভেতরেই থাকে। ইলেকশনের তিন দিন আগে আমরা নির্দেশ পাই। স্যার, আপনার চোখের সামনেই ইতিহাসের এক নির্মম ভোট ডাকাতি ঘটে গেল। সেদিন আপনার কণ্ঠ আমরা শুনিনি।
আপনার সাহস তখন কোথায় ছিল স্যার? আপনি যদি তখন—সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায়—দুর্নীতির ফিরিস্তি জাতির সামনে উন্মোচিত করে এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা না করার দায় দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে সরে দাঁড়াতেন, তাহলে আজ আপনি জাতির কাছে নিঃসন্দেহে একজন কিংবদন্তি হতেন। শুধু সম্মান নয় জাতি বুক পেতে আপনার পাশে দাঁড়াতো।
স্যার আপনার অবসরের দশ বছর পর, সরকার পতনের পর এই বক্তব্য দেওয়ায়—আপনাকে সুবিধাবাদীদের কাতারে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা বলতেই আমার বুক কেঁপে ওঠে, স্যার। কারণ আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করতাম অনেক শ্রদ্ধা করতাম। আরও একটি যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করে— আপনার বক্তব্যে এমন একটি সুর আছে, যেন স্বাধীনতার পর আপনিই একমাত্র সৎ, পেশাদার ও অনন্য সেনাপ্রধান, আর বাকিরা সবাই প্রশ্নবিদ্ধ। তাহলে কি সত্যিই আপনি ছাড়া সবাই দুর্নীতিবাজ ছিলেন স্যার? গত ১৭ বছরে ৩–৪ হাজার অফিসার র্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআই-এ চাকরি করেছে। আরও কয়েক শত এখনো করছে। তারা সবাই কি খুনি? গুমকারী?
এই প্রশ্নগুলো আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না, স্যার। আমি প্রায় দুই যুগ সেনাবাহিনীতে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার মতো হাজার হাজার অফিসার আজও করছে। আমরা তো সেনাবাহিনীর পথে হাঁটতে হাঁটতে এই ব্যাপক দুর্নীতির ছবি দেখিনি। কিন্তু আপনার বক্তব্যের পর—আমরা পরিবারে, সমাজে, এমনকি বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি না। আপনি যখন নির্দিষ্ট কয়েকজন জেনারেলের নাম টেনে এনে পুরো বাহিনীর ওপর ছায়া ফেলেন, তখন প্রায় দুই লক্ষ সেনাসদস্যের গর্ব, স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদা ক্ষতবিক্ষত হয়। একবার কি নিজের বিবেককে প্রশ্ন করেছেন স্যার? আপনি বলেছেন—র্যাবে গুম বা খুনে রাজি না হলে অফিসাররা সেনানিবাসে আশ্রয় নিত। আপনি দু’জনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। স্যার, আমি গোয়েন্দা সংস্থায় চাকরি করেছি। ওই দুইজন অফিসারকে আমি চিনি। দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে তারা মিথ্যা গল্প বলে আপনার কাছে আশ্রয় চেয়েছিল।
র্যাবে সাধারণত ৭০–৮০ জন অফিসার একসাথে থাকে। তাহলে কি বাকি ৭৮ জন সবাই অপরাধী ছিলেন? আজও সেনাবাহিনীতে হাজার হাজার সদস্য আছেন যারা একসময় র্যাবে কাজ করেছেন। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী—তাদের সবাই কি কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে? তাহলে কি সেনাবাহিনীকে “পরিষ্কার” করতে সবাইকে বাদ দিতে হবে? স্যার, আপনার এই বক্তব্যের পর আমরা লজ্জিত। আপনি সেনাপ্রধান থাকাকালে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়াননি। জানি না, আজ সেই নীরবতার জন্য আপনার লজ্জা হয় কি না।
কিন্তু ঢালাওভাবে সেনাবাহিনীকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করার দায় আমরা বহন করতে পারছি না। আমার বিশ্বাস—সেনাবাহিনীর ৯৮ শতাংশ অফিসার ও সৈনিক সৎ ও পেশাদার। কিন্তু যখন একজন সাবেক সেনাপ্রধান পুরো বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তখন জাতির ভালোবাসা ঘৃণায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগে না। এই যন্ত্রণার ভার বহন করতে না পেরে আমি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি— আপনি যদি আপনার বক্তব্য অতিরঞ্জিত ছিল—এ কথা স্বীকার করে নতুন ও দায়িত্বশীল বক্তব্য না দেন, তাহলে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আমি আমার কমিশন সারেন্ডার করব। আমি জানি—আমি একা নই।
আরও অনেক অফিসার এই সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে। স্যার, ৫৪ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীর ইতিহাসকে এভাবে ঢালাওভাবে কলঙ্কিত করতে গিয়ে—এক মুহূর্তের জন্যও কি আপনার বিবেক কেঁপে ওঠেনি? আপনি লিজেন্ড হতে চাইলে হোন—আপনি সত্যিই লিজেন্ড। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে গিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার ডোপামিনে ভেসে—আপনি যদি নিজের বাহিনীকেই জাতির সামনে লজ্জিত করেন, ইতিহাস আপনাকে ক্ষমা করবে না। দুই লক্ষ সেনাসদস্য—যারা এই বাহিনীকে গর্ব ও অহংকারের প্রতীক মনে করে—তারাও করবে না।
আমি চাই না এই লজ্জা আপনার গায়ে ফিরে আসুক। কারণ আপনাকে আমি একদিন প্রাণ দিয়ে শ্রদ্ধা করেছি। আজও সেই শ্রদ্ধার শেষটুকু আঁকড়ে ধরে আছি।
সালামুআলাইকুম স্যার। ক্ষমা চেয়েই এই চিঠির ইতি টানছি।
ইতি জনৈক সেনা অফিসার।
১০ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা সেনানিবাস
সাবেক সেনাপ্রধানকে ঘিরে ক্ষোভের এই খোলা চিঠির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত দায়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজ প্রশ্নের মুখে পড়েছে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা ও মর্যাদা।