মেলবোর্ন, ১১ ফেব্রুয়ারি- ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে জ্বলন্ত মশাল তুলে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন একদল নারী। সেখানকার যানবাহনের শব্দ ছাপিয়ে তাদের কণ্ঠে ওঠে সুতীব্র স্লোগান, ‘মানুষ রক্ত দিয়েছে, এখন আমরা সমতা চাই।’
বাংলাদেশে অনেকের কাছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলো ছিল প্রত্যাশায় ভরা।
১৭ বছর পর একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের আশ্বাস মিললেও- এই নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে বড় দলটিকে অংশগ্রহণ করতে না দিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আগস্ট ২০২৪–এ ছাত্র নেতৃত্বাধীন সহিংস গণআন্দোলনের পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোট হতে চলেছে। ওই সময়ের সংঘাতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হলেও নিহতদের প্রকৃত হত্যাকারী কারা, তা এখনো চিহ্নিত কেরতে পারেনি অর্ন্তবর্তী সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে চাপ ও কারাবাসের মুখে থাকা বিরোধীদলের রাজনীতিকরা এবার প্রকাশ্যে প্রচারে নেমেছেন, বহু বছর পর আবার সভা–সমাবেশে প্রাণ ফিরেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি।
তবে এই নির্বাচনী উত্তেজনার মধ্যেই দেশের বহু নারী, বিশেষ করে যারা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন, উদ্বেগ ও হতাশার কথা বলছেন। তাঁদের আশঙ্কা, রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনীতির শক্তি বাড়লে নারীর অধিকার সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থী তালিকায় নারীর স্বল্প উপস্থিতিও আলোচনার কেন্দ্রে।
মধ্যরাতের সেই মিছিলে অংশ নেওয়া ২৫ বছর বয়সী সাবিহা শারমিন বলেন, “এই নির্বাচন পরিবর্তন আর সংস্কারের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি নারীদের ধীরে ধীরে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশ বহু বছর পিছিয়ে যেতে পারে।”
আগের সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি ছিল জামায়াতে ইসলামী। সে সময় দলটির বহু নেতা গ্রেপ্তার, গুম কিংবা নানা অপরাধে কঠোর সাজা ভোগ করেন। দলটি বরাবরই বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক আইনব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী নতুন উদ্যমে সংগঠিত হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে যাকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীহীন মনে করা হচ্ছিল, সেই বিএনপির শক্ত চ্যালেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সীমিত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী এবার উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে পারে এবং নির্বাচনের পর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, “বিরোধী শক্তি হিসেবেই হোক বা সরকারে থেকে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী ইসলামপন্থী দলের উপস্থিতি স্পষ্ট।”
সমালোচকদের মতে, রক্ষণশীল রাজনীতির প্রভাব সমাজের নানা স্তরে ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় নেতারা মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দিয়েছেন, একে অশোভন বলে উল্লেখ করে। অনেক নারী জানিয়েছেন, চুল না ঢাকলে বা নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক না পরলে তাঁরা হয়রানির মুখে পড়ছেন।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে সংস্কার, নারীর নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির অঙ্গীকার করলেও একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। দলের আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একজন নারী দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন না, কারণ তা ইসলামসম্মত নয়। তাঁর আগের কিছু মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যেখানে তিনি দাম্পত্য ধর্ষণকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
ঢাকার মিছিলে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রী জায়বা তাহজিব বলেন, “এ ধরনের বক্তব্য আমাদের ইরান বা আফগানিস্তানের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই নির্বাচনে নারীর স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য বড় ঝুঁকির মুখে।”
দলটির প্রস্তাবনায় রয়েছে নারীদের দৈনিক কর্মঘণ্টা আট থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করা, যাতে তাঁরা পরিবারে বেশি সময় দিতে পারেন। হারানো আয়ের অংশ রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে বলে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৪৪ শতাংশ নারী, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। তাই কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রবল।
এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়, যখন ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি জানায়, তারা নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর জোটে যুক্ত হবে। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই দলটি নিজেদের প্রগতিশীল বিকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও এবার মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী দিয়েছে।
দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চিকিৎসক তাজনুভা জাবীন এই সিদ্ধান্তের পর দল ছাড়েন। তিনি বলেন, “কয়েকজন শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তে, কোনো আলোচনা ছাড়াই এই জোট করা হয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্নের সঙ্গে এটা যায় না।”
তিনি আরও বলেন, নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে শুধু জামায়াতে ইসলামী বা জাতীয় নাগরিক পার্টিই নয়, বিএনপিও ব্যর্থ। বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে নারীর হার পাঁচ শতাংশেরও কম।
৯১ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনে এর প্রভাব বাড়ে। ২০১১ সালে সংবিধানে আবার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি যুক্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করা অনেক ভোটারই আসলে প্রচলিত দুই দলের রাজনীতিতে হতাশ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদলে থেকেছে এবং উভয় দলই দুর্নীতি ও পারিবারিক রাজনীতির অভিযোগে সমালোচিত।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী জনপ্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট ভোটারের ৪২ শতাংশই প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণ। বিশ্লেষকদের মতে, আগের সরকারের কর্তৃত্বমূলক শাসন অনেককে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নতুন মুখদের একজন মির আহমদ বিন কাসেম আরমান, পেশায় আইনজীবী। ঢাকায় প্রার্থী হওয়া এই রাজনীতিকের বাবা ছিলেন দলের এক শীর্ষ নেতা। আগের সরকারের সময় আরমান আট বছর গোপন বন্দিদশায় নির্যাতনের শিকার হন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তি পান।
তিনি বলেন, “এই অভিজ্ঞতা আমাকে বদলে দিয়েছে। যারা আর ফিরে আসেনি, আমি তাদের কণ্ঠ হতে চাই।”
নারীদের উদ্বেগকে তিনি রাজনৈতিক প্রচারণা বলে আখ্যা দেন। তাঁর ভাষায়, “শহুরে বিতর্কে পোশাক বা শীর্ষ পদে নারীর উপস্থিতি বড় বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নারীদের প্রধান চাওয়া নিরাপত্তা, আর সেটাই আমাদের অগ্রাধিকার।”
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দলের পক্ষ থেকে নারী প্রার্থী দেখা যেতে পারে।
এদিকে ঢাকায় তাঁর নির্বাচনী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর হাজারো নারী সমর্থক রাস্তায় নেমে দলের পক্ষে অবস্থান জানান। ২৭ বছর বয়সী সিরাজিম মুনিরা বলেন, “এই নীতিগুলো নারীদের জীবন নিরাপদ করবে।”
৫৮ বছর বয়সী আইনুন নাহার বলেন, দলের তৃণমূলে নারীরাই বড় শক্তি। তবে তাঁর মতে, ইসলামী আদর্শের কারণে নারীরা শীর্ষ নেতৃত্বে থাকবেন না। “আমরা পেছন থেকে অনুপ্রেরণা জোগাব, দেশকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখব,” বলেন তিনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান