চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ১৭ ফেব্রুয়ারি- জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক এই পালাবদলের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে আংশিক স্থিতি ফিরলেও বিনিয়োগে যে দুর্বলতা দেখা গেছে, তা ১৯৮১ সালের পর সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্সের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রত্যাশা ছিল, গতি আসেনি
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধারণা করা হয়েছিল, সংস্কারমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগের নতুন জোয়ার আসবে। অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে আলোচনার জন্ম দিলেও গত ১৬ মাসে নতুন বড় বিনিয়োগ আকর্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এই সময়ে অনেক ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর এসেছে। কর্মসংস্থানে তার প্রভাব পড়েছে। বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে, নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে এক অঙ্কে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশে স্থবিরতার চিত্রই স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক কোর্টল্যান্ডের অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধিই একটি সরকারের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান সূচক। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কথার চেয়ে কার্যকর নীতিগত সংস্কার কম দেখা গেছে। তিনি মন্তব্য করেন, ১৯৮১ সালের পর থেকে বিনিয়োগে এমন দুর্বলতা আর দেখা যায়নি।
জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমেছে
সরকারি হিসাবে ২০১৯ সালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা ছিল সর্বোচ্চ। কোভিডের সময়ও বড় ধাক্কা লাগেনি। কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে এসে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় দেড় শতাংশ পয়েন্ট পতন গত চার দশকের মধ্যে বিরল।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ, নেমে এসেছে ২৮১ কোটি ডলারে। শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের অন্যতম সূচক এই আমদানি হ্রাস বিনিয়োগে অনীহারই ইঙ্গিত দেয়।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০ বছরের সর্বনিম্ন
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গত ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। গত দুই দশকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বনিম্ন ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছানো, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, করের চাপ—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।
নিট এফডিআই বেড়েছে, কিন্তু নতুন ইকুইটি কম
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট এফডিআই ছিল ১৪২ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। উপরের দিকে এটি ইতিবাচক প্রবণতা মনে হলেও বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও আন্তকোম্পানি ঋণ থেকে।
নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ নেমে এসেছে ৫৫ কোটি ডলারে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এমনকি করোনাকালেও নতুন ইকুইটি ছিল ৭২ কোটি ডলার।
২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এফডিআই ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করা হলেও তা মূলত আগের বছরের নিম্ন ভিত্তির কারণে বেশি দেখাচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদের মত। ওই সময়ে মোট এফডিআই ছিল ১৪১ কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার নতুন ইকুইটি। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন সীমিত।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই। তুলনায় ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। দুই বছর আগেও এফডিআই আকর্ষণে পাকিস্তান বাংলাদেশের পেছনে ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারায় প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে।
বিডার নেতৃত্বে পরিবর্তন, ফলাফল সীমিত
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদেশে কর্মরত ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে দেশে এনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান করা হয়। বিনিয়োগ সম্মেলন, বিদেশ সফর ও প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।
চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনে ঘোষিত প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা বিশ্লেষকদের মতে প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
কাঠামোগত জট কাটেনি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, অগ্রিম ও উৎসে করের চাপ, বন্দর ব্যবস্থাপনায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা এখনো বড় বাধা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজস্বনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নীতির ধারাবাহিকতার অভাবের কথা বলছেন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের সভাপতি রূপালী হক চৌধুরীর মতে, রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, সাহসী কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সামনে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও সরলতা আনা, বন্দর ও লজিস্টিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সেবা সহজ করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রফতানির ভিত্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিট এফডিআই কিছুটা বাড়লেও নতুন বিনিয়োগের গতি ছিল সীমিত। ফলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরছে। এখন প্রশ্ন, নতুন সরকার কি কাঠামোগত সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি বিনিয়োগে এই মন্থরতা আরও দীর্ঘায়িত হবে।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au