অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ ফেব্রুয়ারি- শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোই তাঁর লক্ষ্য। গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। সেই সময় দেশের অর্থনীতি ছিল চাপের মুখে, প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে ছিল প্রশ্ন, আর জনমনে ছিল বড় ধরনের প্রত্যাশা। দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দায়িত্ব পালন শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে নানা অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই মত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্বকালে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অবনমন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্পোৎপাদনে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সংকোচন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস বলেন, একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল ভেঙে পড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অধিকাংশ সূচকই নিম্নমুখী ছিল। ব্যবসায়িক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমেছে, নতুন বিনিয়োগ আসেনি। বরং বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বেড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় দেড় শতাংশ পয়েন্ট পতন গত চার দশকের মধ্যে বিরল ঘটনা। সরকারি বিনিয়োগেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যাংকিং খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষণা সংস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন শীর্ষস্থানে।
ঋণের বোঝাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারি ঋণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে আরও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের দায় নিয়ে বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মূল্যস্ফীতির চাপও পুরোপুরি কমেনি। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় বেড়েছে বেশি। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়ানো হলেও এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বিদায়ি ভাষণে ড. ইউনূস জানান, দেশের রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবাসী আয়ের কারণে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি মোকাবিলা করে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় দেশকে রেখে যেতে পারছেন বলে তিনি স্বস্তি পাচ্ছেন।
এই রিজার্ভ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ভিন্নমতও রয়েছে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শিক্ষক ও গবেষক ড. লুবনা তুরীন এক মন্তব্যে বলেন, রিজার্ভ নিজে কোনো লক্ষ্য নয়, এটি একটি উপকরণ। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতিগত স্বাধীনতা। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো, আমদানি সীমিত করা ও শিল্পখাতে চাপ সৃষ্টি করে রিজার্ভ বাড়ানো হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সংস্কার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন ছাড়া বাকি প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগে সরকারের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়েন। সম্পদ বিবরণী নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ারের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো, কর মওকুফ এবং গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দ্রুত অনুমোদন নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। ঢাকা শহরে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স ও গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতিকে অনেকে বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখছেন।
সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ, ১৮ মাস দায়িত্বে থাকলেও তিনি সরাসরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হননি। বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে সুপারিশপত্র প্রকাশ করা হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, ধর্মীয় সহিংসতা ও মব সৃষ্টির ঘটনায় তাঁর নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ড. ইউনূস বিশ্বজুড়ে ‘তিন শূন্য’ ধারণা প্রচার করে আসছেন, যার লক্ষ্য শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ। কিন্তু দায়িত্বকালে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দুটোই বেড়েছে বলে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা চলছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দায়িত্ব শেষ করে পুরোনো কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলে তিনি আগের মতো দৃঢ়ভাবে সেই স্বপ্নের কথা বলতে পারবেন কি না।
সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন