জুলাই সনদে সাক্ষর অনুষ্ঠান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৯ ফেব্রুয়ারি- জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের রূপরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট বিভাগ-এ রিটটি দায়ের করেন। রিট আবেদনে তিনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ এবং এর অধীনে গৃহীত কার্যক্রমের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়েছেন। পাশাপাশি সনদটিকে অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণারও আবেদন জানানো হয়েছে।
রিটকারীর অন্যতম যুক্তি হলো, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ইতিপূর্বে সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যত বহাল রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন এবং এর অধীনে গণভোট আয়োজন সংবিধান পরিপন্থী ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে দাবি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি আইনবহির্ভূত এবং অবৈধ ঘোষণাযোগ্য।
রিটে বলা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় গণভোট আয়োজন সংবিধানের ৬৫ ও ১২৩(৩)(৪) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া এটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন ছাড়া কোনো কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়—এই যুক্তি তুলে ধরে রিটকারী দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট সনদ সংবিধানবিরোধী ও আইনগত ক্ষমতাবহির্ভূত।
রিটে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ধারা ৬, ৬এ ও ৭ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে নতুন করে সনদ প্রণয়ন এবং গণভোট আয়োজন সংবিধান, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ—সব কিছুর পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে।
সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার, ব্যক্তির মর্যাদা এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। রিটকারীর মতে, প্রশ্নবিদ্ধ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সেই সাংবিধানিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এটি অবৈধ ও অকার্যকর ঘোষণাযোগ্য।
রিটে আরও বলা হয়েছে, সংবিধান বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২—কোথাও অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান নেই। ফলে ওই সরকারের মাধ্যমে প্রণীত সনদ এবং সংশ্লিষ্ট গণভোট সাংবিধানিক ভিত্তিহীন ও বাতিলযোগ্য।
এছাড়া গণভোটের জন্য প্রকাশিত ব্যালট পেপার আইনসম্মত কর্তৃত্ব ছাড়া প্রণীত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে, যা সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের লঙ্ঘন।
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা অসাংবিধানিক। কারণ সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই বলে রিটকারী দাবি করেছেন। তাই সনদ ও এর অধীনে গৃহীত সব কার্যক্রম অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়েছে।
রিটকারী ইউনুছ আলী আকন্দ জানান, রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় ঐকমত কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিচারপতি রাজিক আল জলিলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রিটের শুনানি হতে পারে।
আদালত যদি রিটের প্রেক্ষিতে কোনো আদেশ দেন, তাহলে এর প্রভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপরও পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, সে ক্ষেত্রে এক’শ উচ্চকক্ষের আসনে নির্বাচন স্থগিত হতে পারে এবং ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা নিয়েও সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।
এখন দেখার বিষয়, হাইকোর্ট এ রিটের প্রাথমিক শুনানিতে কী সিদ্ধান্ত দেন এবং জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে চলমান বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।