সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি
মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…
মেলবোর্ন, ২৫ ফেব্রুয়ারি- ১৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় ঢাকাকে সম্প্রতি সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে “জোর গতি বজায় রাখতে” এবং ঝুলে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোতে “দৃঢ় পদক্ষেপ” নিতে বলা হয়। বার্তাটি স্পষ্ট করে দেয়, বাণিজ্য সুবিধার সঙ্গে নিরাপত্তা অবস্থানকে একসঙ্গে বাঁধা হচ্ছে। প্রকাশিত চুক্তিপত্রেও সেই ইঙ্গিত পরিষ্কার।
কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশবাসীকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তাই অপেক্ষা করতে হবে। গোপনীয়তার চুক্তির আড়ালে আলোচনা হয়েছে। এখন যখন পুরো পাঠ প্রকাশ্যে এসেছে, তখন গোপনীয়তার কারণও পরিষ্কার। সচেতন নাগরিকদের বড় অংশ হয়তো এই চুক্তির পক্ষে মত দিতেন না। কারণ এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর বিস্তৃত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নীতি, কৃষি মানদণ্ড, সরকারি ক্রয় এবং নিরাপত্তা সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ পাচ্ছে শর্তসাপেক্ষ শুল্ক ছাড়। সেই শর্ত মানা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করবে একতরফাভাবে ওয়াশিংটন। প্রয়োজনে আবারও শুল্ক আরোপের হুমকিও রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন-পূর্ব সময়ে তাড়াহুড়ো করে এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারে দেশকে আবদ্ধ করা হয়েছে, অথচ ভবিষ্যতে এর দায় বহন করবে নির্বাচিত সরকার। এটি শুধু দুর্বল শাসন নয়, নৈতিক প্রশ্নও তোলে। যে সরকার স্থায়ী নয়, সে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য কঠোর বাধ্যবাধকতা বেঁধে দিতে পারে না।
চুক্তিটি এমনভাবে করা হয়েছে, যেন বিশ্ব এখনও একক শক্তিকেন্দ্রিক। বাস্তবতা ভিন্ন। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সীমান্ত ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপ—সবই গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও অংশীদার। কিন্তু এই চুক্তি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে, তাদের নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বাণিজ্য পদক্ষেপ অনুসরণ করতে এবং যেসব দেশকে ওয়াশিংটন হুমকি মনে করে তাদের থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পদক্ষেপের সমর্থনে “পরিপূরক সীমাবদ্ধতা” আরোপের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সরাসরি ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতিতে।
একাধিক শক্তিকেন্দ্রের বিশ্বে ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো ভারসাম্য রক্ষা করেই টিকে থাকে। ভিয়েতনাম সব বড় শক্তির সঙ্গেই বাণিজ্য করে। ইন্দোনেশিয়া সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখে। সেখানে বাংলাদেশের জন্য একমুখী অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ।
এই চুক্তি শুধু বাংলাদেশ কী করবে তা নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং অন্য দেশের সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি করা যাবে তাও সীমিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত মান বা স্বাস্থ্যবিধি গ্রহণ করলে আপত্তি তোলা হতে পারে। চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করলে তা “বাজার-বহির্ভূত দেশ”-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখা হতে পারে। রাশিয়া বা চীন থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেনা, কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব—সবই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
তবে একটি বড় সম্ভাব্য সুবিধা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। এতে পোশাক খাত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কত পরিমাণ পণ্যে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে, তা স্পষ্ট নয়। একটি “ব্যবস্থা” তৈরি হবে বলা হয়েছে, কিন্তু বিস্তারিত অনির্ধারিত। অর্থাৎ বিস্তৃত অঙ্গীকারের বিনিময়ে অনিশ্চিত সুবিধা।
যুক্তরাষ্ট্র “অন্যায্য বাণিজ্য”, আমদানি বৃদ্ধির চাপ বা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের অধিকারও রেখে দিয়েছে। চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে বলে তারা মনে করলে পূর্ব প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পুনরায় আরোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফাঁক পূরণ না করতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি কার্যত ভৌগোলিক সীমার বাইরে প্রভাব বিস্তারের নীতি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ইলেকট্রনিক লেনদেনে শুল্ক আরোপ স্থগিত রাখার স্থায়ী সিদ্ধান্ত সমর্থন করার কথাও বলা হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য রাজস্ব-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য নির্ধারিত নমনীয়তা উপেক্ষা করার ইঙ্গিত রয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে সব ভর্তুকির পূর্ণ তালিকা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। স্বচ্ছতা জরুরি, কিন্তু শুল্কের হুমকির মুখে চাপিয়ে দিলে তা সহযোগিতা নয়, চাপ প্রয়োগ।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত যেকোনো কৃষি জীবপ্রযুক্তি পণ্য বাংলাদেশে আমদানি ও বাজারজাতের অনুমতি দিতে হবে, আলাদা দেশীয় যাচাই বা লেবেলিং ছাড়াই। দক্ষিণ এশিয়ায় জিন-পরিবর্তিত ফসল নিয়ে জনআস্থা, কৃষকের স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন জড়িত। এখানে তাড়াহুড়ো সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
চুক্তিতে নির্দিষ্ট পণ্য কেনার তালিকাও যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, তরলীকৃত গ্যাস, কৃষিপণ্য। বাংলাদেশ বিমানের জন্য ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজের কথাও উল্লেখ আছে। লোকসানী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ওপর এমন ক্রয় বাধ্যবাধকতা আর্থিকভাবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালতের রায়ে পুরো চুক্তি বাতিল না হলেও এর শুল্ক কাঠামো দুর্বল হয়েছে। পরে ট্রাম্প বিকল্প আইনি ধারায় শুল্ক আরোপের পথ নিয়েছেন। অর্থাৎ চাপ কমেনি, কেবল আইনি ভিত্তি বদলেছে।
এই পরিস্থিতিকে ঢাকার জন্য সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। নতুন করে আলোচনায় বসে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য ও টেকসই শর্ত নিশ্চিত করা দরকার। অন্তত পাঁচটি বিষয় জোর দিয়ে তুলতে হবে।
প্রথমত, একতরফা শুল্ক পুনর্বহালের পরিবর্তে নিরপেক্ষ বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা সমন্বয়ের ধারা বাদ দিয়ে স্পষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক ক্ষেত্রে সীমিত রাখা উচিত।
তৃতীয়ত, কৃষি জীবপ্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন পর্যালোচনা ও লেবেলিংয়ের অধিকার রাখতে হবে।
চতুর্থত, সরকারি ক্রয়ের নির্দিষ্ট তালিকা বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক ও আর্থিকভাবে টেকসই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
পঞ্চমত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বিতর্কিত ডিজিটাল ইস্যুতে আগাম অবস্থান নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা তুলে নিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে পথ একটাই, ভারসাম্য রক্ষা করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বাণিজ্য দরকার, কিন্তু তার বিনিময়ে নীতিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
মূল প্রতিবেদনঃ দ্য ডেইলি স্টার, অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
ড. এম. জি. কিবরিয়া একজন বাণিজ্য ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মর্গান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। এর আগে তিনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে কাজ করেছেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au