বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী–কে রাজ্যসভার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারি- ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী–কে রাজ্যসভার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, তিনি হবেন ভারতের প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পরিচয়ের সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু একটি মনোনয়ন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক পরিসরে অন্তর্ভুক্তির নতুন বার্তা।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে সমানাধিকারের দাবি জোরালো হয়েছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলন, আদালতের লড়াই এবং সামাজিক প্রচারের মধ্য দিয়ে LGBTQ সম্প্রদায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমানতা অর্জন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই মনোনয়নকে একাধারে প্রতীকী এবং তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তৃণমূল কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন। জাতীয় রাজনীতিতে যেখানে পরিচয়ভিত্তিক প্রশ্নগুলো এখনও বিতর্কিত, সেখানে একজন খোলাখুলি LGBTQ ব্যক্তিত্বকে সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
মেনকা গুরুস্বামী দেশের সুপরিচিত মানবাধিকার আইনজীবী। বিশেষ করে LGBTQ অধিকারের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে সওয়াল করে আসছেন। তাঁর আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমতা এবং মর্যাদার অধিকার।
২০১৮ সালে ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির বিতর্কিত Section 377–এর একটি বড় অংশ বাতিল করে দেয়। ব্রিটিশ আমলের এই আইন সমকামীদের মধ্যে সম্মতিসূচক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করত। আদালত নিজেদের ২০১৩ সালের রায় খারিজ করে জানায়, যৌন অভিমুখিতা ব্যক্তির মৌলিক পরিচয়ের অংশ এবং তা সংবিধানসম্মত সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
এই ঐতিহাসিক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মেনকা গুরুস্বামী ও তাঁর সহকর্মী অরুন্ধতী কাটজু। আদালতে তাঁদের যুক্তি ও অবস্থান LGBTQ অধিকারের আন্দোলনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই রায়কে ভারতে নাগরিক অধিকারের লড়াইয়ে এক বড় মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়।
আইনি লড়াইয়ের সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি পান এই দুই আইনজীবী। ২০১৯ সালে Time ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় জায়গা করে নেন মেনকা গুরুস্বামী ও অরুন্ধতী কাটজু। ব্যক্তিগত সাহস, পেশাগত দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের আইকন।
রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, মেনকার সম্ভাব্য সংসদে প্রবেশ কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি দেশের LGBTQ সম্প্রদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বহু বছর ধরে সামাজিক বৈষম্য, আইনি বাধা এবং সামাজিক কলঙ্কের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে তাঁর উপস্থিতি যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার, বৈষম্যবিরোধী আইন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণের প্রশ্নে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এই মনোনয়ন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে কি না, তা সময় বলবে। তবে এ কথা নিশ্চিত, রাজনীতির মূল স্রোতে LGBTQ প্রতিনিধিত্বের সম্ভাবনা দেশকে এক নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ওয়াল