বিশ্ব

যেভাবে ইরানের সুপ্রিম লিডার হয়ে উঠেন খামেনি

  • 5:35 pm - March 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৯ বার
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১ মার্চ- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত। ধর্মীয় শিক্ষার্থী থেকে রাষ্ট্রপতি এবং পরে দেশের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে ওঠা তাঁর এই পথচলা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। ছোটবেলা থেকেই শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। মাশহাদ ও পরে কোম শহরে ইসলামি আইন ও দর্শনে উচ্চতর শিক্ষা নেন। তরুণ বয়সে তিনি ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি পান এবং ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য নজরে আসেন।

১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে ইরানের তৎকালীন শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন খামেনি। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি–এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং কারাবন্দি থাকেন। এই সময়েই ধর্মীয় নেতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত হয়।

ইসলামি বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় উত্থান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহের পতনের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে খামেনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। বিপ্লবী পরিষদ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে করতে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

১৯৮১ সালে তিনি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময় ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলছিল, যা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চরম সংকটে ফেলে। সে সময় সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি–এর মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। যদিও তখন তিনি শিয়া ধর্মে সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদার আলেম ছিলেন না, তবুও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাঁকে এই পদে বসানো হয়।

এরপর থেকেই তিনি ইরানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচারব্যবস্থার প্রধান নিয়োগদাতা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে তাঁর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও সংসদের ওপরও তাঁর প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

খামেনির নেতৃত্বে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রাখে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামূলক নীতি গ্রহণ করা হয়। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েন চলে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমঝোতা হলেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পায়।

২০০৯ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নের কারণে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ে।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

২০২২ সালে এক তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হওয়া হিজাববিরোধী আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ তোলে, বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় খামেনির নেতৃত্ব নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনা তীব্র হয়।

সাম্প্রতিক এক সমন্বিত সামরিক অভিযানে খামেনি নিহত হয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যৌথ সামরিক অভিযানে খামেনি নিহত হয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম অশুভ ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন।

গতকাল(শুক্রবার)ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় একযোগে হামলা চালানো হয়। কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।

হামলায় ইরানের শাসনব্যবস্থার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবিঃ সংগৃহীত

খামেনির মৃত্যুর পর এখন ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সর্বোচ্চ নেতার পদটি দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য, উত্তরসূরি নির্বাচন এবং সামরিক কাঠামোর ভূমিকা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ধর্মীয় শিক্ষার্থী থেকে প্রায় চার দশক দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্থান ও শাসন ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে। তাঁর জীবন ও নেতৃত্বকে ঘিরে বিতর্ক যেমন ছিল, তেমনি সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন ইসলামি বিপ্লবের ধারক। বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা এখন সময়ই বলবে।

এই শাখার আরও খবর

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের নতুন দফায় ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানে নতুন দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী…

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au