ইসরায়েলে হাইপারসনিকসহ তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি ইরানের। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ মার্চ- ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে, সর্বশেষ ৩৪তম দফার অভিযানে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি আইআরজিসির বিবৃতির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ার বিমান ঘাঁটিতে অবস্থান করা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি এবং হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দরকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েলের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছে।
ইরানের এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ইরান থেকে তাদের ভূখণ্ডের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে এবং সেগুলো প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। এ সময় ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক দল ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছেন।
অন্যদিকে লেবানন থেকেও ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ রকেট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আটকানো হলেও দুটি প্রজেক্টাইল মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানে এবং এতে কয়েকজন ইসরায়েলি আহত হন। তদন্তে দেখা গেছে, রকেটগুলো শনাক্ত করা গেলেও সময়মতো প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলছে এবং জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।
এই উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টেলিফোনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। ক্রেমলিনের বরাত দিয়ে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, আলোচনায় পুতিন দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে রাজনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন পুতিন। সেই আলোচনায় ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে পারে এবং এটি পরিকল্পনার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার কোনো সুস্পষ্ট যৌথ পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কৌশল না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার তারা নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫টি ড্রোন শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং একটি সাগরে পড়ে গেছে। পাশাপাশি ৩৫টি ড্রোনের মধ্যে ২৬টি ধ্বংস করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ বলেছেন, ইরানে মঙ্গলবারই সবচেয়ে তীব্র হামলা হতে পারে। তিনি দাবি করেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এতে বোঝা যাচ্ছে ইরান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ইরানে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে আজারবাইজান। দেশটির জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের টেলিফোন আলাপের পর এই সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবও দিয়েছে ইরান। দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান কোনো হুমকিকে ভয় পায় না এবং অতীতেও অনেক শক্তিশালী শক্তি ইরানকে পরাজিত করতে পারেনি। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেন, নিজের অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
এরই মধ্যে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে নতুন করে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলসহ ইসফাহান, তাবরিজ ও আহভাজে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও জানা না গেলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
চলমান সংঘাতের আজ ১১তম দিনেও যুদ্ধ বন্ধের কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ইরান সরকারের বিভিন্ন বার্তায় বলা হয়েছে, তারা পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখবে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলও নতুন করে হামলা শুরু করেছে বলে দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা, রয়টার্স