ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতি উৎপাদন হচ্ছে কি না এবং পণ্য তৈরিতে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর গত বুধবার জানায়, উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতি উৎপাদনের অভিযোগে বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এর একদিন পর বৃহস্পতিবার তারা আরও একটি ঘোষণা দিয়ে জানায়, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর পৃথক তদন্ত চালানো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিয়েসন গ্রির জানিয়েছেন, তদন্তে যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। তিনি বলেন, জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে কোনো দেশ মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করছে কি না, সেটিও এই তদন্তে যাচাই করা হবে।

বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র , ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তার মেয়াদ জুলাই মাসে শেষ হওয়ার আগে এসব তদন্ত শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই তদন্তের আওতায় বাংলাদেশের পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দেশের নামও রয়েছে। এর মধ্যে চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য। বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশ বিশ্ববাজারে বিশেষ করে পোশাক খাতে বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় তাদের ওপরই নজর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জানিয়েছে, তদন্ত শুরুর পর তালিকাভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি দেশকে আগামী ১৭ মার্চের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হবে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
তদন্তে মূলত দেখা হবে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর। একই সঙ্গে যাচাই করা হবে, এসব দেশের নীতি বা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বাধা বা চাপ সৃষ্টি করছে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক হলে দেশটি প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত শুরু করলেও এতে বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি দেখছেন না তারা। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা চাইলে সে অনুযায়ী জবাব দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চু্ক্তি করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। ছবিঃ বিবিসি
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক নীতি বাতিল করে দেওয়ার পর বিকল্প উপায়ে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতেই এই তদন্ত শুরু করেছে ওয়াশিংটন। এর আগে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তখন বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে “এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড” নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে সেটি এখনো কার্যকর হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের মনে করেন, যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেশি হয়, মূলত সেসব দেশকেই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তালিকায় এসেছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত যাচাই করতে চায় কোনো দেশ ভর্তুকি, বিশেষ সুবিধা বা সস্তা শ্রমের অপব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখছে কি না, যার ফলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজার অর্থনীতিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় ভবিষ্যতের চাহিদা মাথায় রেখেই শিল্প উদ্যোক্তারা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ‘অতি উৎপাদন সক্ষমতা’ কথাটি বলছে, সেটির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা কী হবে তা পরিষ্কার নয়। কারণ বাজারে চাহিদা বাড়লে সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদকরা আগে থেকেই সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখেন, যা শিল্প অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, ছবি : সংগৃহীত
তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত শুরু করার আগেই বাংলাদেশকে এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা যায়।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের ঘাটতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য নীতি ও তদন্তের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে।