ভাষণ দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সমাবেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ভাষণে তিনি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের আহ্বানই জানাননি, বরং পরিবর্তনের পর ‘অত্যাচারীদের হিসাব নেওয়া হবে’ বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার এই মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সমাবেশে দেওয়া ভাষণের শুরুতেই উপস্থিত জনসমাগমের প্রশংসা করেন মোদী। তিনি বলেন, যত দূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যাচ্ছে। এই সমাবেশ সফল করতে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছেন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সমাবেশে অংশ নিতে আসা মানুষদের আটকাতে শাসক দল নানা বাধা সৃষ্টি করেছিল। তার অভিযোগ, সেতু বন্ধ করা, রাস্তা অবরোধ করা, যানজট তৈরি করা, গাড়ি আটকে দেওয়া, পোস্টার ছেঁড়া ও পতাকা খুলে নেওয়ার মতো নানা চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব বাধা সত্ত্বেও মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে কাউকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময় শেষ হওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।
ভাষণের প্রায় সাত মিনিটের মাথায় প্রথমবারের মতো কঠোর সতর্কবার্তা দেন মোদী।
তিনি বলেন, সেই দিন আর বেশি দূরে নয় যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এরপরই তিনি বলেন, কোনো অত্যাচারীকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং খুঁজে খুঁজে তাদের হিসাব নেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে অতীতের নানা ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ের জনসভাগুলোতেও মোদী পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে ব্রিগেডের সমাবেশে তিনি সেই বক্তব্যের সঙ্গে নতুন করে যোগ করেন ‘হিসাব নেওয়ার’ প্রসঙ্গ। ভাষণের বিভিন্ন অংশে তিনি অন্তত তিনবার একই ধরনের সতর্কবার্তা দেন।
সমাবেশটি ছিল রাজ্য বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র সমাপনী অনুষ্ঠান। গত ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ১০ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে কলকাতায় এসে দলের রাজ্য নেতৃত্ব ব্রিগেড সমাবেশের প্রস্তুতি নেয়। দলীয় সূত্রের দাবি, এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অন্যতম বড় সমাবেশ। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বাসে করে মানুষ আনা হয় এবং উত্তরবঙ্গ থেকে বিশেষ ট্রেন ভাড়া করে কর্মী-সমর্থকদের আনা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমাবেশের মাধ্যমে বিজেপি তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ব্রিগেডে বড় সমাবেশ হলেই যে তা ভোটে সাফল্যে পরিণত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতে বামফ্রন্ট সরকার আমলেও বিশাল সমাবেশ হয়েছে, কিন্তু সব সময় তা নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়নি।
ভাষণের মাঝামাঝি সময়ে আবারও কঠোর বার্তা দেন মোদী। তিনি বলেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলে অপরাধীদের জেলে পাঠানো হবে এবং সেটিই হবে তার গ্যারান্টি। এ সময় তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। পিএম বিশ্বকর্মা, পিএম সূর্যঘর, আয়ুষ্মান ভারত এবং চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্প রাজ্যে পুরোপুরি চালু হতে দেওয়া হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেরা কাজ না করা এবং অন্য কাউকে কাজ করতেও না দেওয়া। তার দাবি, কাটমানি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকল্পের সুবিধা গ্রাম বা দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয় না। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নাম পরিবর্তন এবং সুবিধাভোগীর তালিকায় অনিয়মের অভিযোগও তোলেন তিনি।
জলজীবন মিশন প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, অন্য অনেক রাজ্যে ঘরে ঘরে নলবাহিত পানি পৌঁছে গেছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
কর্মসংস্থান ও নারী নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। রাজ্যের তরুণ-তরুণীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, তাদের পড়াশোনা শেষ করার পর যাতে পশ্চিমবঙ্গেই কাজ পাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করা হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে আসতে বলে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
ভাষণের ৩৭ মিনিটের দিকে আবারও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন মোদী। তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের সময় শেষের দিকে এবং বিজেপি সরকার গঠিত হলে একদিকে উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করা হবে, অন্যদিকে অতীতের অন্যায়গুলোর হিসাব নেওয়া হবে। তার ভাষায়, যারা মানুষকে ভয় দেখায় তাদের ভয় পাওয়ার সময় শুরু হতে যাচ্ছে। অপরাধী, অনুপ্রবেশকারী এবং তোষণের রাজনীতি যারা করে তাদের জায়গা হবে জেলে।
ভাষণে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও ‘নির্মম সরকার’ শব্দ ব্যবহার করে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন। পাশাপাশি তৃণমূলের কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করেন।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অসম্মান করার অভিযোগ নিয়েও তিনি কথা বলেন এবং ঘটনাটিকে আদিবাসী সমাজ, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ ও সংবিধানের প্রতি অপমান হিসেবে বর্ণনা করেন। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিরোধের প্রসঙ্গ এবং অতীতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বালাকোট অভিযানের প্রমাণ চাওয়ার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে ব্রিগেডের সমাবেশকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বলে উল্লেখ করেন মোদী। তিনি বলেন, এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, এটি ভয় কাটানোর নির্বাচন এবং ব্যবস্থার পরিবর্তনের নির্বাচন।
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা