মেলবোর্ন, ১৯ মার্চ- ইরানের অভ্যন্তরে অন্যতম প্রভাবশালী আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ ফোর্স’ (Basij Force) এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানি ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে বাহিনীটির কার্যক্রম। এই বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে ধারণা রাখেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
এরই মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গোলামরেজা সোলাইমানির পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে চরমতম প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের নতুন এই পরিস্থিতির মধ্যে ‘বাসিজ ফোর্স’ বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছে ওটিএন বাংলা।
যেভাবে প্রতিষ্ঠিত
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হাতে প্রতিষ্ঠিত বাসিজ ফোর্স এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘সাজমান-এ বাসিজ-এ মোস্তাজাফিন’। এই বাহিনী মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অধীন পাঁচটি বাহিনীর অন্যতম। আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী এই বাহিনীর সদস্যরা ‘বাসিজি’ নামে পরিচিত।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, নৈতিক পুলিশিং, বিক্ষোভ দমন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে এরা কাজ করে। সাধারণ ইরানিদের কাছে ‘বাসিজি’ এক আতঙ্কের নাম। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে এই বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন গোলামরেজা সোলেইমানি।
কারা নিয়োগ পান এই বাহিনীতে
সাধারণত ইরানের তরুণ ও শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষকে এই বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যাদেরকে দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নেতৃত্বের প্রতিও অনুগত থাকতে হয়। প্রায় ১ লাখ মানুষ এই বাহিনীটির নিয়মিত সদস্য। এছাড়াও ৬ লক্ষ সদস্যকে তাৎক্ষণিক তলবের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ সদস্য রয়েছে এই বাহিনীতে।
বর্তমানে এই বাহিনী তরুণ ইরানিদের নিয়ে গঠিত। যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঐতিহ্যগতভাবে শিয়া। তারা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত গোষ্ঠী থেকে আসে। বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এই বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেয় ওই তরুণরা।
বাজিসিদের মূল কাজ দেশের সংবিধান এবং ইসলামি বিপ্লবের লক্ষ্য ও বিশ্বাসকে রক্ষা করা। এর বাইরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ও অপ্রত্যাশিত ঘটনায় জনগণকে সহায়তা করা। এই বাহিনী মূলত ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কট্টর সমর্থক হয়ে কাজ করে।
অভ্যন্তরীণ আন্দোলন দমনে ব্যবহার
ইরানের বিভিন্ন সময়ে যে বড় বড় আন্দোলন হয়েছে, তা দমনে এই বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে দেশটির সরকার। ‘বাসিজি’রা অত্যন্ত নির্মমভাবে সেইসব আন্দোলন দমন করে গেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ‘গ্রিন রেভল্যুশন’ ‘২০২২-২৩ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন এবং মাশা আমিরি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়া উঠা হিজাববিরোধী আন্দোলনে এই বাহিনী নিষ্ঠুরতম আচরণ করে। সবশেষ চলতি বছর সরকারবিরোধী আন্দোলনে যে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়, তার সাথে বাসিজ ফোর্সের নাম উঠে আসে।
নৈতিক পুলিশিং
ইরানে সমাজে ‘নৈতিকতা বজায়’ রাখার নামে এরা বাসিজ ফোর্স শুধু নিয়মিত টহলই দেয় না, বলা চলে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এছাড়া যুদ্ধেও অংশগ্রহণ এই বাহিনীর সদস্যরা। এর আগে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বাসিজিরা ফ্রন্টলাইনে মানবঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। সেই সময় মাইনফিল্ড পরিষ্কার মিশনেও অংশ নেয়।
বাসিজ বাহিনী প্রায়ই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সমালোচিত হয়। যে কারণে তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে।
খুন-ধর্ষণ-যৌন সহিংসতা
আইআরজিসি এর অংশ হওয়ার কারণে অনেক বছর আগে থেকেই বাসিজকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন এবং সৌদি আরব সরকার সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে। এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মতো বড় বড় অপরাধের অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ৪৫ জন ভুক্তভোগীর কথা উল্লেখ করেছে, যারা বাসিজ সদস্যদের দ্বারা লাঠি ও হোসপাইপের মতো বস্তুর সাহায্যে ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ভয়াবহ ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।