বিশ্ব

ভারতে ছয় দশকের নকশাল আন্দোলন: দীর্ঘ সশস্ত্র অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে যেভাবে

  • 8:53 pm - March 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৮ বার
পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদি জঙ্গিগোষ্ঠি। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৫ মার্চ- দার্জিলিঙের নকশালবাড়ি থেকে যে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা একসময় ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায় ছয় দশক পর এসে সেই আন্দোলন এখন প্রায় ইতিহাসের অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশে মাওবাদী নেতৃত্বের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ সশস্ত্র অধ্যায়ের কার্যত সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৯৬৭ সালের জুলাই মাস। দার্জিলিঙের ছোট্ট গ্রাম নকশালবাড়ি। জমির অধিকার, ফসলের ন্যায্য ভাগ এবং দীর্ঘদিনের শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে উঠছিল কৃষকদের মধ্যে। সেই ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দেয় একদল বামপন্থী নেতা ও কর্মী। শুরু হয় জমি দখল, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে লড়াই। ঠিক এই সময়েই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আসে বড় এক ঘোষণা। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘রেডিয়ো পিকিং’ জানায়, ভারতে বিপ্লবের নতুন সূচনা হয়েছে। তারা নকশালবাড়ির ঘটনাকে “ভারতীয় বিপ্লবের অগ্রদূত” হিসেবে আখ্যা দেয়।

এই ঘোষণাই আন্দোলনটিকে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব দেয় এবং দেশের ভেতরে এক ধরনের তাত্ত্বিক ও মানসিক শক্তি জোগায়। তখন চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলছে। পুরনো সংস্কৃতি, চিন্তা ও ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিদ্রোহের ডাক দেওয়া হয়েছে। সেই প্রভাব ভারতে, বিশেষ করে বামপন্থী রাজনীতির একাংশে গভীরভাবে পড়ে।

নকশালবাড়ির আন্দোলনের পর খুব দ্রুতই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের সশস্ত্র আন্দোলনের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, এমনকি কাশ্মীরেও এর প্রভাব দেখা যায়। শহরের ছাত্র-যুবকরা দলে দলে গ্রামে গিয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন। তাদের লক্ষ্য ছিল কৃষকদের সংগঠিত করে “মুক্তাঞ্চল” তৈরি করা এবং ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা।

১৯৬৯ সালে একাধিক মাওবাদী সংগঠনের জন্ম হয়। ছবিঃ সংগৃহীত

এই সময়টাতে আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের আবেগঘন আকর্ষণ তৈরি হয়। অনেক তরুণ নিজেদের পরিবার, পড়াশোনা, চাকরি ছেড়ে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাদের বিশ্বাস ছিল, বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ভেঙে নতুন এক সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে শুরু থেকেই এই আন্দোলনের ভেতরে ছিল মতপার্থক্য। কে কোন পথ অনুসরণ করবে, কীভাবে সংগ্রাম পরিচালিত হবে, তা নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে একাধিক মাওবাদী সংগঠনের জন্ম হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সিপিআই (এমএল) এবং অন্যান্য গোষ্ঠী।

আন্দোলন যত ছড়াতে থাকে, সহিংসতাও তত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কলকাতা ও আশপাশের শহরগুলোতে গেরিলা হামলা, হত্যাকাণ্ড, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। পুলিশের সদস্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি সন্দেহভাজন “শ্রেণিশত্রু”দের ওপর হামলা চালানো হয়।

এই সহিংসতার ফলে সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে আন্দোলনকারীদের উগ্রতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ১৯৬৭ সালের ‘অপারেশন হাতিঘিসা’ দিয়ে শুরু হয় পুলিশের অভিযান। এরপর গ্রামে গ্রামে তল্লাশি, গ্রেপ্তার, সংঘর্ষ চলতে থাকে।

১৯৭১ সালে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে সেনা, আধাসেনা ও পুলিশের যৌথ অভিযানে শুরু হয় ‘অপারেশন স্টিপলচেজ’। এই অভিযানের মাধ্যমে সংগঠিতভাবে নকশাল আন্দোলন দমন করা হয়।

গোপণ আস্তানায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাওবাদী সেনারা। ছবিঃ সংগৃহীত

এই সময়েই দেখা যায়, আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। যেসব কৃষক একসময় আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তারাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কারণ, সহিংসতা এবং অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল।

১৯৭২ সালের মধ্যে প্রথম দফার নকশাল আন্দোলন কার্যত ভেঙে পড়ে। নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত, গ্রেপ্তার বা আত্মগোপনে চলে যায়। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ধসে পড়ে।

তবে আন্দোলন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এটি দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগড় ও ওড়িশার জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায় মাওবাদীরা নতুন করে সংগঠিত হয়।

এই সময় তারা “গেরিলা যুদ্ধ” কৌশল গ্রহণ করে। দুর্গম এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তুলে ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালায়। তবে শহরাঞ্চলে তারা আর আগের মতো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

পশ্চিমবঙ্গে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আবারও মাওবাদী কার্যক্রম কিছুটা বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে জঙ্গলমহল এলাকায়। মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার কিছু অংশে সংঘর্ষ, হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের ঘটনা ঘটে।

২০০৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে ল্যান্ডমাইন হামলার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর নিরাপত্তা অভিযান আরও জোরদার করা হয়।

২০১১ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণ, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং আত্মসমর্পণ নীতির কারণে মাওবাদী কার্যক্রম অনেকটাই কমে আসে।

অন্যদিকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়। “ক্লিয়ার, হোল্ড, বিল্ড” নীতির মাধ্যমে প্রথমে এলাকা দখল, পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শেষে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হয়। এর ফলে মাওবাদীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলনের উত্থানের পেছনে প্রধান কারণ ছিল সামাজিক বৈষম্য, জমির অধিকার নিয়ে অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক হতাশা। স্বাধীনতার পরও অনেক এলাকায় ভূমি সংস্কার না হওয়া, প্রশাসনিক অবহেলা এবং দরিদ্র মানুষের বঞ্চনা এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

তবে আন্দোলনের পতনের পেছনে কাজ করেছে একাধিক কারণ। সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন আন্দোলনকে দুর্বল করে। সাধারণ মানুষের সমর্থন হারানো ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। পাশাপাশি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক নিরাপত্তা অভিযান এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগও বড় ভূমিকা রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, আন্দোলন ক্রমশ সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ফলে তারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

সাম্প্রতিক সময়ে মাওবাদী নেতৃত্বের আত্মসমর্পণ এবং সংগঠনের দুর্বলতা এই দীর্ঘ আন্দোলনের শেষ অধ্যায়কে স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন এটি আর সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কার্যকর নেই।

তবে এই আন্দোলনের প্রভাব ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিতে গভীরভাবে রয়ে গেছে। সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত, রাজনৈতিক চিন্তায় এর প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকের কাছে এটি প্রতিবাদের প্রতীক, আবার অনেকের কাছে সহিংসতার এক অন্ধ অধ্যায়।

ছয় দশকের এই যাত্রা দেখিয়েছে, কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এটাও প্রমাণ করেছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ছাড়া স্থিতিশীল সমাজ গড়া যায় না।

দার্জিলিঙের সেই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ একসময় যে দাবানলে পরিণত হয়েছিল, তা আজ প্রায় নিভে এসেছে। কিন্তু তার ছায়া, শিক্ষা এবং বিতর্ক এখনো রয়ে গেছে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে।

সূত্রঃ আনন্দবাজার

এই শাখার আরও খবর

ঈদুল গাদিরে দুই হাজারের বেশি বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিলেন মোজতবা খামেনি

মেলবোর্ন,০৬জুন-ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল গাদির উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা মওকুফ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের বিচার…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

ইসরায়েল ও ইরানের ওপর চটলেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ৫ জুন-  দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল এবং ইরান উভয়ের প্রতিই কড়া বার্তা দিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি একদিকে বেসামরিক…

ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগে দুই নার্সের বিচার ঘিরে নতুন বিতর্ক

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্স সারা আবু লেবদেহ ও আহমদ রাশাদ নাদিরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রোগীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বহুল আলোচিত মামলার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au