জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দিয়ে ভিডিও পোস্ট
মেলবোর্ন, ২৮ মার্চ- শরীয়তপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে দুর্বৃত্তরা এই আগুন লাগায় বলে জানা গেছে।…
মেলবোর্ন, ২৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে শ্রীলঙ্কা। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি আবারও চাপের মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশটির মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ক্যান্ডি-তে এক সকালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের বরাদ্দ জ্বালানি সংগ্রহ করতে দেখা যায় তিন চাকার টুকটুক চালক কীর্থি রত্নাকে। আগে প্রয়োজন অনুযায়ী যখন খুশি জ্বালানি কিনতে পারলেও এখন তাকে সপ্তাহে নির্ধারিত মাত্রা অনুযায়ী জ্বালানি নিতে হচ্ছে। তার জন্য সরকার নির্ধারণ করেছে সপ্তাহে মাত্র ২০ লিটার পেট্রোল।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত করে দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
শ্রীলঙ্কা তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে এবং এর বড় অংশই এই প্রণালি দিয়ে আসে। কিন্তু প্রণালিতে চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে সরকার ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় চালু করা কিউআর কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা আবারও চালু করেছে।

কিউআর কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা আবারও চালু করেছে শ্রীলঙ্কা। ছবিঃ আল জাজিরা
বর্তমান ব্যবস্থায় মোটরসাইকেলের জন্য সপ্তাহে ৮ লিটার, টুকটুকের জন্য ২০ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ২৫ লিটার, বাসের জন্য ১০০ লিটার ডিজেল এবং পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য ২০০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সীমিত এই জ্বালানিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সার সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। ফলে সার সংকট দেখা দিলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং এর প্রভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি অনেক শ্রীলঙ্কান নাগরিকের কাছে ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে-এর শাসনামলে ভুল অর্থনৈতিক নীতির কারণে দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণে খেলাপি হয়। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তীব্র হওয়ায় জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সীমিত হয়ে পড়ে এবং বাজারে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সেই সংকটের জেরে ২০২২ সালের জুলাইয়ে গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রাজাপাকসে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কীর্থি রত্না বলেন, আগের সংকটের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য হলো এবার সংকটের কারণ দেশের ভেতরের নয়, বরং বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি। তার ভাষায়, “এই সংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দোষ দেওয়া যায় না।”
বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুরা দিসানায়েকে-এর নেতৃত্বাধীন সরকার এই সংকট মোকাবিলায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে বাস ভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদের মুখপাত্র নালিন্দা জয়তিসা। তবে জ্বালানির দাম কমলে ভাড়াও কমানো হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য এই আশ্বাস খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না, কারণ আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শিরান ইলানপেরুমা মনে করেন, জ্বালানি সংকটের প্রভাব শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়বে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যতটা বেড়েছে, স্থানীয়ভাবে ততটা বাড়ানো হয়নি। এতে করে সরকার জনগণের ওপর পুরো চাপ না দিয়ে নিজেই একটি বড় অংশ বহন করছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শ্রীলঙ্কা সরকার সপ্তাহে একদিন, বিশেষ করে বুধবার সরকারি অফিস ও স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানির ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনা করছে শ্রীলঙ্কা। এ জন্য রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী রোমান মারশাভিন সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন।
অন্যদিকে ইরান থেকেও জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি, কারণ জ্বালানি পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজের অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য সপ্তাহে ২০০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। ছবিঃ আল জাজিরা
দেশটিতে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লিট্রো গ্যাসের সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৮ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর গ্যাসের দামও প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি রেশনিং ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সরকারের হাতে তেমন কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার মজুত সক্ষমতা মাত্র এক মাসের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারে।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার নতুন আটটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা অতিরিক্ত এক সপ্তাহের জ্বালানি মজুতের সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় ত্রিনকোমালিতে একটি পুরনো জ্বালানি সংরক্ষণাগার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ শ্রীলঙ্কা চীন থেকে সার আমদানি করে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যদি এই সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে শ্রীলঙ্কা আবারও এক অনিশ্চিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় দেশটির জন্য সামনে সময়টা যে কঠিন হতে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au