বাংলাদেশ

প্রফেসর ড. শ্যামল দাসের বিশ্লেষণ

জিয়া কি একজন ষ্টুপিড সামরিক কর্তা ও রাজনীতিক ছিলেন?

  • 7:58 pm - March 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫০৩ বার
জিয়া কি একজন ষ্টুপিড সামরিক কর্তা ও রাজনীতিক ছিলেন?ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৮ মার্চ- প্রশ্নটি প্রথম শুনলে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। এমনকি অনেকে ক্ষুব্ধও হতে পারেন-একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার সম্পর্কে এ ধরনের প্রশ্ন তোলা কি শোভন? কিন্তু এই প্রশ্নটি আমি তুলছি না তাঁর বিরোধিতা থেকে; বরং তুলছি তাঁর উত্তরাধিকারীদের বক্তব্য শুনে। কারণ আজ যারা জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করেন তাঁদের কথাবার্তা শুনলে বারবার মনে হয়, তাঁরা হয় জিয়াকে চিনতেন না, নয়তো তাঁকে এমন এক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যিনি নিজের ইতিহাস নিজেই বুঝতেন না।

আজ যদি বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা চাননি, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: জিয়া কেন তাঁকে “জাতির পিতা” বলেছিলেন? কেন তিনি তাঁর নিজের লেখায় ৭ মার্চের ভাষণকে “গ্রীন সিগন্যাল” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন? কেন ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন “শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে”? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এই যে, যদি তিনি নিজেই স্বাধীনতার একমাত্র ঘোষক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর নিজের লেখায় সেই দাবি অনুপস্থিত কেন?

এই প্রশ্নগুলোই আমাদেরকে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি জায়গায় নিয়ে যায়: সমস্যা কি জিয়ার মধ্যে, নাকি তাঁর উত্তরাধিকারীদের বয়ানের মধ্যে?

প্রথমেই আসা যাক ৭ মার্চের ভাষণের প্রসঙ্গে। জিয়াউর রহমান তাঁর নিজের প্রবন্ধে লিখেছেন—৭ মার্চের ভাষনে বলা “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” ছিলো  তাঁদের কাছে একটি “গ্রীন সিগন্যাল”। অর্থাৎ, এটি ছিল সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান না হলেও, যুদ্ধের প্রস্তুতির সংকেত। এখন প্রশ্ন হলো, যে মানুষটি স্বাধীনতা চাননি, তাঁর ভাষণ আবার কিসের গ্রীন সিগন্যাল? যদি মুজিব স্বাধীনতা না চাইতেন, তাহলে জিয়া কীসের জন্য সেই ভাষণ থেকে সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত পেলেন? তাহলে কি জিয়া রাজনৈতিক সংকেত পড়তে অক্ষম ছিলেন? নাকি আজকের বয়ান সেই ইতিহাসকেই অস্বীকার করছে?

এখানেই ব্যঙ্গের জায়গাটি তৈরি হয়। কারণ, জিয়ার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী ৭ মার্চ ছিল মুক্তিযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। কিন্তু আজকের কিছু রাজনৈতিক বক্তৃতায় সেটিকে প্রায় “অপ্রাসঙ্গিক” করে তোলার চেষ্টা করা হয়। এতে করে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে জিয়ার নিজের ব্যাখ্যা ও তাঁর অনুসারীদের ব্যাখ্যা পরস্পর বিরোধী।

দ্বিতীয়ত, আসা যাক স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্নে। ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য হলো, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান সেই ঘোষণাটি পাঠ করেন, “on behalf of Sheikh Mujibur Rahman”। তিনি মুজিবকে তাঁর মহান নেতা (“Great Leader”) বলে আখ্যায়িত করেন; অর্থাৎ, তিনি একজন “স্বাধীনতা না চাওয়া” রাজনীতিককে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর “মহান নেতা” হিসেবে অভিহিত করেন; এটি সঠিক হলে জিয়ার রাজনৈতিক জ্ঞান ও বিচক্ষনতা নিয়েই কি প্রশ্ন ওঠেনা? তবে কি তিনি ষ্টুপিড ছিলেন? তাঁর অনুসারীদের কথা শুনলে এমনটাই কি মনে হয়না?

এখানে জিয়ার ভূমিকা কোনোভাবেই ছোট হয় না; বরং তা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই ভূমিকা বিকৃত করে তাঁকে একমাত্র ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। কারণ, এতে করে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, জিয়ার নিজের ভূমিকাকেও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি জিয়া সত্যিই নিজেকে একমাত্র ঘোষক মনে করতেন, তাহলে তাঁর নিজের লেখায় সেটি এত গুরুত্ব পায়নি কেন? কেন তাঁর “একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধে তিনি সাত’ই মার্চের অনুপ্রেরণা, পাকিস্তানি দমন-পীড়ন, বাঙালী জাতীয়তাবাদ, এসব নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু নিজের ঘোষণাকে কেন্দ্রীয় দাবি হিসেবে তুলে ধরেননি? এমনকি একবারের জন্যও নিজের ঘোষনার কথাটি বলেননি? এমন একটি ঘটনাকে তিনি কেন ভুলে গেলেন যেটি বাঙ্গালী  জাতির জন্ম-মুহূর্ত বলে জিয়ার সৈনিকেরা দাবী করেন?

এই নীরবতাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, জিয়ার নিজের উপলব্ধি এবং পরবর্তী জিয়াবাদী রাজনীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক রয়েছে। আমার ধারনা, জিয়া তাঁর তথাকথিত “ঘোষনাটিকে” তেমন মূল্যবান কিছু মনে করতেননা।

তৃতীয়ত, আসা যাক তারিখের গড়বড় প্রসঙ্গে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, সরকারি নথি ও পরবর্তী বর্ণনায় ২৬ মার্চ ও ২৭ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। জিয়া ১৯৭১ সালেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র দখল করেন, এবং এরপর “এয়ারে” যেয়ে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানান; এখানেও তিনি একবারের জন্যও বলেননি, তিনি কোন “ঘোষনা” দিয়েছিলেন? কেন? এমনকি প্রথম ঘোষণার পর সংশোধিত ঘোষণার কথাও এসেছে যেখানে তিনি নিজেকে “অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান” হিসেবে দেখানোর বিষয়টি থেকে সরে এসে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা দেন। তবে কি জিয়া আসলেই ষ্টুপিড ছিলেন যিনি নিজের “রাষ্ট্রপ্রধান” টাইটেলটি ত্যাগ করেন স্বাধীনতা না চাওয়া একজন রাজনীতিকের সমর্থনে? এমনকি ১৯৭৬ সালে জিয়ার অধীনস্ত তথ্য অধিদপ্তর ১৯৭১ এর ঘোষনা সংক্রান্ত একটি টাইমলাইন প্রকাশ করে যেখানে তাঁর “ঘোষনার” দিনটি দেখানো হয় ২৭শে মার্চ। জিয়া কি তবে তাঁর ঘোষনার তারিখ সম্পর্কে বিভ্রন্ত ছিলেন?

এই ঘটনাগুলো দেখায়, এটি একটি তাৎক্ষণিক, অস্থির ও গতিশীল পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু আজকের রাজনৈতিক বয়ান এটিকে একটি সরল, একমাত্রিক গল্পে পরিণত করতে চায়। যেন সবকিছুই ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নির্ভুল, এবং একজন মেজরের হঠাৎ করে ত্রাতা হিসেবে উদিত হওয়ার ইতিহাস। ইতিহাসের এই অসত্য ও অতিরিক্ত সরলীকরণই আসলে সমস্যার মূল।

চতুর্থত, এখানে আমরা একটি তাত্ত্বিক বিষয় দেখতে পাই; সেটি হল, collective memory বা সমষ্টিগত স্মৃতির রাজনীতি। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতকে পুনর্লিখন করে। এই প্রক্রিয়ায় “hero substitution” ঘটে, মানে এক নায়ককে সরিয়ে আরেক নায়ককে বসানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, এই substitution করতে গিয়ে তারা জিয়ার নিজের টেক্সটকেই অস্বীকার করছে। এমনটি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায়নি।

অর্থাৎ, আজকের কিছু জিয়াবাদী বয়ান আসলে ইতিহাসের পাঠবিরোধী ও দলিল-অস্বীকারকারী  (anti-textual, anti-archival) প্রবণতাকে তুলে ধরে। তারা দলিলের চেয়ে বয়ানকে, ইতিহাসের চেয়ে শঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে একটি অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি হয় যেখানে জিয়ার নাম ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তাঁর নিজের কথাই উপেক্ষা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসেঃ জিয়া কি সত্যিই একজন ষ্টুপিড সামরিক কর্তা ও রাজনীতিক ছিলেন? নাকি তাঁকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যাতে তিনি একজন বিভ্রান্ত, স্মৃতিভ্রষ্ট, এবং আত্মবিরোধী ব্যক্তি হিসেবে প্রতীয়মান হন?

বাস্তবতা হলো, সমস্যা জিয়ার মধ্যে নয়; সমস্যা তাঁর উত্তরাধিকারীদের বয়ানে। কারণ তারা এমন একটি ইতিহাস নির্মাণ করতে চায়, যা দলিলের সঙ্গে মেলে না, জিয়ার নিজের কথার সঙ্গেও মেলে না।

সবশেষে বলা যায়, জিয়াকে ছোট করছেন তাঁর বিরোধীরা নয়; ছোট করছেন তাঁর উত্তরাধিকারীরা। কারণ তারা এমন এক জিয়া নির্মাণ করেছেন, যিনি নিজের লেখা পড়েননি, নিজের বক্তব্য মনে রাখেননি, এবং যার কাছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল যুদ্ধের সংকেত, অথচ বঙ্গবন্ধু নিজে কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজে নাকি স্বাধীনতাবিরোধী!

তাহলে প্রশ্নটি আবারও উঠে আসে, সমস্যা কোথায়? ইতিহাসে, নাকি ইতিহাসের শঠ এবং অসৎ বয়ানে?

ডিসক্লেইমার: মতামত বিভাগে প্রকাশিত কোনো লেখা বা বিশ্লেষণ একান্তই লেখকের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন। ওটিএন বাংলা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কার্সন

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার খ্যাতিমান লেখক ও কবি অ্যান কার্সন। ধ্রুপদি সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ ও…

পোল্যান্ডের স্কুলে ছুরিকাঘাতে নিহত ১, আহত ২

পোল্যান্ডের একটি স্কুলে ১৫ বছর বয়সী এক সাবেক শিক্ষার্থীর ছুরিকাঘাতের ঘটনায় একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে…

তুচ্ছ ঘটনায় ঢাবি অধ্যাপককে সব ক্লাস থেকে অব্যাহতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেকাব পরা…

যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সোমবার অনুষ্ঠিত এসব বৈঠক ‘ল্যান্ড ফোর্সেস ইন্টারন্যাশনাল…

হরমুজে নৌ চলাচলের নিরাপদ করিডর গঠনে ওমানের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নিরাপদ নৌ চলাচলের করিডর গঠনে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। তেহরান বলছে, প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ…

তিন ঘণ্টা ব্যবধানে জাপানের পূর্বাঞ্চলে জোড়া ভূমিকম্প

জাপানের পূর্বাঞ্চলে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে চিবা ও ইবারাকি প্রিফেকচারের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। তবে কোনো…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au