মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- তেরো বছর আগের ঘটনা। দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ৭ জুন। ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার কামদুনি। সেদিন ‘রাজারহাট ডিরোজিও কলেজে’র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিপ্রা ঘোষকে গণধর্ষণের পর বীভৎসভাবে খুন করে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত আনসার আলি এবং তার কয়েক সহযোগী।
আনসার আলিরা সেদিন শিপ্রা ঘোষকে ধর্ষণের পর তার জ্ঞান থাকা অবস্থাতেই দুই পা টেনে মাঝখান থেকে নাভি পর্যন্ত চিরে ফেলে তার শরীর। এখানেই থেমে থাকেনি ওই দুর্বৃত্তরা- মেয়েটির গলা কেটে পাশের একটি মাঠে লাশ ফেলে দেয়।
আনসার আলিদের বাঁচিয়ে দেন মমতা
সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি পুরো ভারত কেঁপে উঠেছিল। শুধু একজন দৌড়ে এসেছিলেন আনসার আলি, সাইফুল আলি, আমিনুর আলি, ভুট্টো মোল্লা, এনামুল মোল্লা ও আমিন আলিদের বাঁচাতে। তিনি হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের ভোট ব্যাংক রক্ষায় প্রশাসনকে ব্যবহার করে সেই অপরাধীদের আইনের মারপ্যাঁচে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মমতা বলেছিলেন, ‘এটা ছোট্ট ঘটনা।’
শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার পায়নি শিপ্রা ঘোষের পরিবার। যেমন বিচার হয়নি- নাদিয়ার হাঁসখালি গণধর্ষণ-হত্যার, দুর্গাপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণের। বিচার পয়নি আরজি কর মেডিকেল কলেজের সেমিনার হলে শিক্ষানবিশ নারী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যার। সবশেষ বিচার না পাওয়ার উদাহরণ কসবার ল’ কলেজে তৃণমূল নেতার ছেলে ও তার সহযোগীদের দ্বারা গণধষণের শিকার মেয়েটির পরিবারও।
এসব ঘটনা বীভৎসতার সব সীমা অতিক্রম করেছিল। আর জি করের মেয়েটিকে ধর্ষণের পর পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে নগ্ন অবস্থায় ফেলা রাখা হয়েছিল। কসবা ল’ কলেজের মেয়েটি বেঁচে যায় সৌভাগ্যক্রমে। হকিস্টিক দিয়ে নির্মমভাবে পেটানোর মৃত ভেবে তাকে ফেলে যায় ধর্ষকরা।
রুখে দাঁড়িয়েছিলেন টুম্পা কয়াল
কামদুনিতে মমতার সেই পক্ষপাতের বিরুদ্ধে ওই সময় যারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মুখ টুম্পা কয়াল। কামদুনি আন্দোলনের এই নেত্রী রোববার যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। দলের সল্টলেক কার্যালয়ে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের হাত থেকে গেরুয়া শিবিরের পতাকা হাতে নেন টুম্পা।
ধারণা করা হচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করবে বিজেপি। মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার না পেয়ে সম্প্রতি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন আরজি কর মেডিকেল কলেজের সেই শিক্ষানবিশ নারী চিকিৎসকের মা। তিনিও বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়ছেন।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ব
বিজেপিতে যোগ দিয়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ নেন টুম্পা কয়াল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলন করেছি বলে খুনের হুমকি দিয়েছে, বাড়ির সামনে বোমা মেরেছে। ২০২৪ সালে আমার স্বামীকেও প্রাণে মারার চেষ্টা হয়। এ বার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ব। দুর্নীতিবাজ সরকারকে হারাব। তাই বিজেপিতে যোগ দিলাম।’
তবে প্রার্থী হওয়া নিয়ে মুখ খোলেননি টুম্পা। বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি মধ্যমগ্রাম থেকে লড়তে চান।
মমতার কারণে বিচার হয়নি যেসব ঘটনার
২০১২ সালে পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ: কলকাতার এক নারীকে গণধর্ষণ করা হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, এটা “মনগড়া গল্প” আর “নাটক”। তিনি আরও বলেছিলেন, “ছেলে-মেয়েরা এখন বেশি মিশছে- সমাজটা যেন খোলা বাজারের মতো হয়ে গেছে।”
একই বছরে কাটোয়া গণধর্ষণ: ৩১ বছর বয়সী এক বিধবাকে নির্মমভাবে গণধর্ষণ করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী সেখানেও বলেন, নির্যাতিতার পরিবার আর বিরোধী দল মিলে রাজনীতি করার জন্য এই ঘটনা সাজিয়েছে।
২০২২ সালে হাঁসখালি গণধর্ষণ ও খুন: তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতার ছেলের হাতে ১৪ বছরের এক কিশোরী ধর্ষিত ও নিহত হয়। সেই ঘটনাতেও মমতা প্রশ্ন তোলেন- “ওটা ধর্ষণ ছিল না, গর্ভধারণ না প্রেমের সম্পর্ক?”
২০২৫ সালে দুর্গাপুর গণধর্ষণ: একজন মেডিক্যাল ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়। মমতা উল্টো দোষ দেন সেই মেয়েটিকেই। বলেন, “রাত ১২টা ৩০-এ বাইরে ছিল কেন? মেয়েদের রাতে বাইরে যেতে দেওয়া উচিত নয়।”
এসব ঘটনার শিকার হওয়া মেয়েদের পরিবারের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে তারা বিচার পাননি। ন্যায় বিচার পেতেই এবার নির্যাতিত পরিবারের এই দুই সদস্য ভোটের মাঠে লড়াইয়ে নেমেছে। তারা বলছেন, শুধু নিজের মেয়ে হত্যার বিচারই নয়, পুরো পশ্চিমবঙ্গে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের জন্য লড়াই করবেন তারা।
কসবা ল’কলেজে গণধর্ষণের নেতৃত্বে তৃণমূল নেতার ছেলে
আর জি করের ঘটনা নিয়ে যখন কলকাতা শহর উত্তাল, তখন সেই কলকাতার কসবা ল’ কলেজের এক ছাত্রীকে স্থানীয় তৃণমূল নেতার ছেলে মনোজিৎ মিশ্রের নেতৃত্বে গণধর্ষণের পর তার উপর নারকীয় নির্যাতন চালানো হয়।
২০২৫ সালের ২৫ জুনের সেই ঘটনায় অভিযোগ উঠে, তৃণমূলের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদ নেতা মনোজিৎ মিশ্র ও তার দুই সঙ্গী মেয়েটিকে গণধর্ষণ করে। এরপর তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হকিস্টিক দিয়ে মাথায় একের পর এক আঘাত করা হয়। এছাড়াও ঘটনার একাধিক ভিডিও করে রাখা হয়।
এই ঘটনারও যথারীতি কোনো বিচার করেনি মমতার প্রশাসন। অভিযুক্তদের বাঁচিয়ে দিতে নানান কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।