এপ্রিলের শুরুতেই বিজেপির ইশতেহার, থাকছে বড় প্রতিশ্রুতি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই নির্বাচনী ইশতেহার বা ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি(বিজেপি)। দলটি জানিয়েছে, সরকার গঠন করতে পারলে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হবে এই সংকল্পপত্রে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তত সাতটি মূল খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহারটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিজেপির এই ইশতেহারে রাজ্যের বর্তমান আর্থিক সংকট মোকাবিলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার আনা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গুর ইস্যুতে এবার স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। স্থানীয় জমির মালিকদের সম্মতি নিয়ে সেখানে শিল্প উদ্যান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
ইশতেহারে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনামলকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। গত পাঁচ দশককে ‘অবনমনের অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করে বিজেপি দাবি করছে, বাম আমলের অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ এবং তৃণমূল আমলের দুর্নীতির কারণে রাজ্যের শিক্ষা, প্রশাসন ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কংগ্রেস আমলের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে কম করা হয়েছে এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টিও ইশতেহারে উঠে এসেছে।
ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। কয়লা, বালি ও পাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ দখল ও লুটপাট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করা বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রেও একাধিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে মাসিক ভাতা তিন হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের আওতায় বেকার যুবক-যুবতীদের মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা ৪৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ করা এবং সব শূন্যপদে স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, অপরাধ দমনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং নারীদের নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বড় বড় নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এবং রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সুন্দরবন থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নত করে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং মালদহ ও বালুরঘাটে বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে কৃষকদের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা, বীজ ও সার সরবরাহে স্বচ্ছতা আনা, আলুচাষি ও মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় বাজার গড়ে তুলে দুই দেশের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার কথাও বলা হয়েছে।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সিঙ্গুরে শিল্প উদ্যান গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজ্যে চারটি বৃহৎ শিল্প পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গাপুর ও বার্নপুরে ইস্পাত শিল্পের উন্নয়ন, আসানসোল, হাওড়া ও ব্যারাকপুরের শিল্পাঞ্চল পুনরুজ্জীবন এবং চা ও পাট শিল্পের উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষা খাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, শিক্ষক সংকট দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গে আইআইটি ও আইআইএম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং নতুন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানো, ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করা এবং ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহার প্রকাশের আগে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র বা ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করেছে বিজেপি। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, সেই অভিযোগগুলোর সমাধান কীভাবে করা হবে, তা এই সংকল্পপত্রে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এই ইশতেহার তৈরির কাজ কয়েক মাস ধরেই চলছিল। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের মতামত সংগ্রহ, বিশিষ্ট নাগরিকদের পরামর্শ গ্রহণ এবং দলীয় কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই এই ‘সর্বসমন্বিত’ সংকল্পপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে ঠিক কবে এবং কার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
সূত্রঃ আনন্দবাজার