অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তে অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানির ওপর শুল্ক কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমে গেলে জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ঘোষণা দিয়েছে, আগামী তিন মাসের জন্য প্রতি লিটার পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আরোপিত শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। এর ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ২৬.৩ সেন্ট কম দিতে হবে ভোক্তাদের। দেশটির অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্স জানিয়েছেন, এতে গড়ে ৬৫ লিটারের একটি ট্যাংক পূরণে প্রায় ১৯ ডলার সাশ্রয় হবে।
সরকার এই পদক্ষেপকে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখালেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, জ্বালানির দাম কমে গেলে মানুষ বেশি ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে, ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়বে এবং সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হবে। এতে মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে আরও বাড়তে পারে।
স্বাধীন অর্থনীতিবিদ সল এসলেক বলেন, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, তবে অর্থনৈতিকভাবে এটি সঠিক পদক্ষেপ নয়। তার মতে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য সাধারণত মানুষের অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কিন্তু শুল্ক কমানোর ফলে সেই প্রভাবটি কমে যাবে এবং অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হবে।
বর্তমানে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ বাড়লে সুদের হার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ক্রিস রিচার্ডসনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় সরকার জনগণকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘায়িত করেছিল। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে ছয় মাসের জন্য শুল্ক অর্ধেকে নামানো হয়েছিল। সে সময়ও কিছুটা সময় নিয়ে হলেও এর সুফল ভোক্তারা পেয়েছিলেন। তবে এবারও একই ধরনের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানির দাম কমানো হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলেছেন, যাতে জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
এদিকে শুধু ব্যক্তিগত যানবাহন নয়, ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রেও কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের জন্য আরোপিত সড়ক ব্যবহার চার্জ তিন মাসের জন্য শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে ট্রাক পরিচালনাকারীদের প্রতি লিটারে অতিরিক্ত ৩২.৪ সেন্ট দিতে হবে না। এছাড়া এই চার্জ বৃদ্ধির পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তাদের মতে, এতে পরিবহন খরচ কিছুটা কমবে এবং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ সচল রাখা সহজ হবে। তবে জ্বালানির শুল্ক কমানোর বিষয়ে তারা কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, এতে জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার একটি বার্তা যায়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকারের এই দুই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রায় ২.৫৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সড়ক ব্যবহার চার্জ বৃদ্ধি স্থগিত রাখার কারণে আরও প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্স বলেছেন, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণকে সহায়তা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, উচ্চ জ্বালানি দামের কারণে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও কমাতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলও এই কর কমানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর বলেছেন, এটি অনেকদিনের দাবি ছিল এবং এর ফলে পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর ওপর ব্যয়ের চাপ কমবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল থাকবে।
তবে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে এবং সুদের হার আরও বাড়ানোর পথ তৈরি করতে পারে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ