‘জুলাই আদেশ’ সংবিধানের ওপর প্রতারণা: আইনমন্ত্রী
মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- ‘জুলাই আদেশ’কে আইনি ভিত্তিহীন এবং সংবিধানের ওপর প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, এটি মূলত একটি ‘কালারেবল লেজিসলেশন’, যার মাধ্যমে সংবিধানে…
মেলবোর্ন, ৩১ মার্চ- দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের ঘাটতি ঘিরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদামতো তেল না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটেছে, আর পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গিয়ে গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এতে তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ সামলাতে গিয়ে পাম্পকর্মীরাও হিমশিম খাচ্ছেন, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তেল কোম্পানিগুলো থেকে পাম্পগুলোতে যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসন ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকট ঘিরে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় অকটেন না পেয়ে বিক্ষুব্ধ বাইকাররা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শরীয়তপুরে তেল না পেয়ে দেড় শতাধিক কৃষক একটি পেট্রোল পাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। নড়াইলে তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এক ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপককে ট্রাকচাপায় হত্যার অভিযোগও উঠেছে। এই ঘটনায় ট্রাক জব্দ ও চালককে আটক করা হয়েছে।

কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক পাম্পে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে এবং মজুতদারি ঠেকাতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো স্পর্শকাতর এবং যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতেও। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তারা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, একদিন ৯ হাজার লিটার ডিজেল পাওয়ার পর পরদিন কোনো তেলই পাওয়া যায়নি, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা। ছবিঃ সংগৃহীত
একই অবস্থা প্রাণ-আরএফএল গ্রুপসহ অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীরও। তাদের বিপুলসংখ্যক ট্রাক পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হলেও চাহিদার তুলনায় মাত্র ৬০ শতাংশ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ জানিয়েছেন, তেল না পাওয়ায় তাদের গাড়ির মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
গাজীপুরের পুবাইলে অবস্থিত একটি হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদনে ধস নামার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তৈরি পোশাক শিল্পেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে। কারখানাগুলো বিদ্যুতে চললেও লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে জ্বালানি আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে ডিজেল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র ৯টি, একটি পথে রয়েছে এবং বাকি জাহাজগুলোর সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে দেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সীমিত শোধন ক্ষমতার কারণে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

জ্বালানি সংকটে বাড়তে পারে সাপ্তাহিক ছুটি ও ফিরতে পারে অনলাইন ক্লাস। ছবিঃ সংগৃহীত
জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের কারণে ঈদের আগে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলেও পরে তা তুলে নেওয়া হয়। তবে বর্তমানে ডিপো থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবারও রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি উঠছে শিল্পমালিকদের পক্ষ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সীমিত জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাবছে। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, ঘরে বসে কাজের সুযোগ, অফিস সময় কমানো বা পরিবর্তন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর মতো পদক্ষেপ বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে বিধিনিষেধ আরোপের কথাও ভাবা হচ্ছে।

গভীর জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সরকারি অফিসগুলোকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে বলেছে। দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রতিটি অফিসে নজরদারি দল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সরবরাহ বাড়ানোই নয়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণও জরুরি হয়ে উঠেছে। ইউটিলিটি-চালিত চাহিদা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (ডিএসএম) প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো ও নিয়ন্ত্রণ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান প্রশাসনের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অতীতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট শুধু পরিবহন বা দৈনন্দিন জীবনেই নয়, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ পুরো অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au