তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ এপ্রিল- বাংলাদেশে তেলের জন্য ঝগড়ার পর গ্রাহককে পিটিয়ে হত্যা, তেল না পেয়ে ট্রাক চাপায় পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যার মতো ভয়াবহ সব অভিযোগ যখন সামনে আসছে, তখন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ আরও ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছে। গণমাধ্যমটি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ‘তেল-শূন্য’ দেশ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি নির্ভরশীল উল্লেখ করে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ইনডিপেনডেন্ট বলছে, এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় চরম জ্বালানি সঙ্কট দেখে দিয়েছে। সুদীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। তাতেও মিলছে না চাহিদা মত। বাধ্য হয়ে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি নিয়েই ফিরতে হচ্ছে তাদের। আবার ভিন্ন চিত্রও আছে- কেউ কেউ অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে ফিরছেন খালি হাতে। বাধ্য হচ্ছেন ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে ফেলে রাখতে।
সহসা মিটছে না সমস্যা
সহসাই যে এই সমস্যা মিটছে না, সেই আশঙ্কাও করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ করে শেষ হবে, কোনো পক্ষই তা নিদিষ্ট করে বলতে পারছে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে এই সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। এটিই পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার সহজ পথ। এই পথে এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ হয়ে থাকে।
এমন আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে তেলের রেশনিং, অফিসের কর্মঘণ্টা কমানোসহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি তেল পেতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পাশাপাশি রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ধরনা দিচ্ছে সরকার।
নতুন সূচিতে অফিস, মার্কেট
জ্বালানি সাশ্রয়ে আগামী রোববার থেকে সরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আর দোকানপাট ও বিপণিবিতানহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের মধ্যরাতে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো হবে। এ সময়ে কোনো নতুন যানবাহন, নৌযান, আকাশযান ও কম্পিউটার সামগ্রী কেনা হবে না।’
শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে
অফিস ও বিপণিবিতানের জন্য নতুন সময়সূচি নির্ধারণের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন আর তিন দিন অফলাইনে ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, আগামী রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে সরকারের এমন প্রস্তাবে অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন, দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস রমজানের ছুটির পর অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশের পক্ষে অনলাইনে ক্লাস করার অর্থিক সক্ষমতা নেই। সব বিবেচনায় তারা চান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক নিয়মেই চলুক।
তেলের রেশনিং
গত ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কায় রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল সরকার। তবে ভারত থেকে তেল সরবরাহের পর ১৫ মার্চ রেশনিং পদ্ধতি বাতিল করা হয়। কিন্তু রেশনিং বাতিল করে তেল নেওয়ার নির্দিষ্ট সীমা তুলে দেওয়া হলেও যোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি সরকারের পক্ষে।
মজুদের তথ্যে অস্পষ্টতা
সরকারের দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১শে মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন। এছাড়াও ৭ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় চাহিদা দিনে ১২ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসাবে মজুদ থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিন চলবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন সরবরাহ না এলে অবশ্যই সঙ্কটে পড়বে বাংলাদেশ।

তেলের অপেক্ষায় কৃষক
ট্যাগ অফিসার নিয়োগ
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য পেট্রোল পাম্পগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১৬ জন, ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন, চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০ জন, রাজশাহীর ৮ জেলায় ৩৪০ জন, খুলনার ১০ জেলায় ৩০১ জন কর্মকর্তা ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি বিভাগগুলোতেও একইভাবে দায়িত্ব হবে।
কী বলছে সরকার
যদিও সরকার বলছে, দেশে তেলের কোনো সঙ্কট নেই। তারপরও অনেকেই ‘প্যানিক বাইং’ এবং ‘মজুদ’ করে কিছুটা সঙ্কট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির রয়েছে। এছাড়াও আমেরিকা ও চীনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে। রাশিয়া থেকে তেল আনার জন্য চেষ্টা চলেছে।
ভরসার নাম সেই ভারত
বাংলাদেশ জ্বালানির সঙ্কট মোকাবিলায় ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে তেল আনতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সেখান থেকে ২২ হাজার টন ডিজেল এসেছে বাংলাদেশ। আরও ডিজেল পেতে ভারত সরকারের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ধারণা করা হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ডিজেল আসবে।
সবচেয়ে সঙ্কটে কৃষি
জ্বালানি তেলের সঙ্কটে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও সেচভিত্তিক বিভিন্ন ফসল চাষ ব্যাহত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে প্রভাব প্রকট হয়েছে। তেল না পেয়ে কৃষকরা সেচ পাম্প চালাতে পারছেন না। কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা, এই পরিস্থিতি অব্যহত থাকলে ফসলহানি আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসি ও পদ্মা-মেঘনা-যমুনার অদূরদর্শিতায় বাংলাদেশে দেশে তেলের সংকট। ছবিঃ সংগৃহীত