সামিরে কাঁপছে ভারত-পাকিস্তান
মেলবোর্ন,৬ এপ্রিল- ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও ক্রিকেটের মঞ্চে এক নামই যেন দুই দেশকে এক সুতোয় বেঁধেছে-‘সামির’। চলমান Indian Premier League (আইপিএল) ও Pakistan…
মেলবোর্ন, ৫ এপ্রিল- ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতা করতে গিয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে পাকিস্তান। সব পক্ষকে খুশি করার কৌশল নিতে গিয়ে দুই কূলই হারিয়েছে দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যানের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে ইসলামাবাদের।
পাকিস্তানের এমন অবস্থাকে ‘দ্বিমুখী ধাক্কা’র ‘বহুমুখী বিপদ’ বলে উল্লেখ করে তারা বলছেন, ‘আগ বাড়িয়ে স্পর্শকাতর যুদ্ধের মধ্যস্থতা করতে গিয়ে চরম বিপদে পড়তে হয়েছে পাকিস্তানকে। সবাইকে খুশি করতে গিয়ে কাউকেই খুশি করতে পারেনি তারা।
এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ করেই বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় উঠে আসে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে দেশটি। এর কারণ দুই দেশের সঙ্গেই পাকিস্তানের ‘ভালো’ সম্পর্ক ছিল।
এছাড়া যুদ্ধ বন্ধ করতে পারলে ইসলামাবাদের নিজেরও অনেক লাভ ছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের তেলের ট্যাঙ্কারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পারলে জ্বালানি সংকট থেকে আপাতত মুক্তি পেত পাকিস্তান।
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’- এর এক প্রতিবেদন বলছে, ইরান সরাসরিই পাকিস্তানকে জানিয়েছে- কোনো মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করবে না তারা। এরফলে পাকিস্তানের সেই উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়।
আরেকটি ঘটনাও পাকিস্তানের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষ করে ইরানের হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির অতিতৎপরতা ক্ষুব্ধ করেছে। সৌদি আরব এই ঘটনার পর অসন্তুষ্ট হয়েছে।
সম্পর্কের এমন টানাপোড়েনের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানকে তাদের দেওয়া ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২.৯ লাখ কোটি টাকা) ঋণ অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বর্ডম্যান এক্স-এ করেছেন, ‘মনে হচ্ছে পাকিস্তান নিজেদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি কিছু করার চেষ্টা করেছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিণতি হয়েছে।’
অন্যদিকে পাকিস্তানের এই কৌশলের বিপরীতে ভারতের অবস্থান ছিল বেশ পরিমিত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত নিজেদের পরিকল্পিত পথ অনুসরণ করেছে। জ্বালানি স্বার্থ রক্ষায় অপরিশোধিত তেলের উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য এনেছে।
যদিও প্রথমে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উত্থান ভারতের জন্য একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সর্বদলীয় বৈঠকে স্পষ্ট করে বলেন, ‘ভারত ভূ-রাজনীতিতে কোনো দালাল দেশ হিসেবে কাজ করবে না।’
এখন দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কোনো ফল দেয়নি। অন্যদিকে, সতর্ক অবস্থানের মাধ্যমে ভারত নিশ্চিত করেছে যে কোনো একক অংশীদারিত্ব যেন তাদের জন্য ফাঁদ হয়ে না দাঁড়ায়।
পাকিস্তান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তার আদান-প্রদানকারী হিসেবে কয়েকদিন কাজ করেছে। এর মধ্যে গত ২৫ মার্চ ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাকিস্তান পেশ করে। যে শর্তের মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার শর্ত ছিল।
কিন্তু ইরান এর পাল্টা হিসেবে প্রকাশ্যে ৫-দফা প্রস্তাব দেয়। এর মাধ্যমে তেহরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতা সরাসরি অস্বীকার করে। গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে ইরান জানায়, ‘পাকিস্তানের কূটনৈতিক ফোরামগুলো তাদের নিজস্ব, আমরা সেখানে অংশ নেইনি।’

ইরানের সঙ্গে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত চলছে, ছবিঃ সংগৃহীত
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারেনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসলামাবাদের মাটিতে ইরানের স্পিকারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের কথা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামাবাদে প্রতিনিধি পাঠাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় সেই সম্ভাবনা ভেস্তে যায়।
পাকিস্তানের এই ব্যর্থতার কারণে শান্তি প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মধ্যস্থতাকারী অন্য দুই দেশ তুরস্ক ও মিশর এখন কাতার বা ইস্তাম্বুলের মতো বিকল্প স্থানে আলোচনার কথা ভাবছে। এই ঘটনাটি ইসলামাবাদের প্রতি তেহরানের ক্রমবর্ধমান আস্থার ঘাটতিকেই নির্দেশ করছে।
মূলত পাকিস্তান ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। আর সৌদি আরবের সাথে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি তো আছেই। এই চুক্তি অনুযায়ী এক দেশের ওপর হামলা মানেই দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ পাকিস্তান তাই এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে শঙ্কিত।
এই কূটনৈতিক সংকটের মাঝেই আরব আমিরাত তাদের ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দ্রুত ফেরত চেয়ে পাকিস্তানকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের মাঝে ইরানের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় আবুধাবি বেশ অখুশি। এই যুদ্ধের শুরু পর থেকে ইরান আমিরাতের দিকে ২৫০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল–শারা। ছবি: এএফপি
পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা মে মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই অর্থ পরিশোধ করবে। অতীতে এই দেশগুলো পাকিস্তানকে ঋণ পরিশোধে সময় দিলেও (রোলওভার) বর্তমানে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এর ফলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে। এরই মধ্যে দেশটিতে জ্বালানি সংকটে তেলের ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, কমানো হয়েছে সরকারি ব্যয় এবং স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইরানের প্রত্যাখ্যান আর উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তিক্ততা- সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন কূটনৈতিক গোলকধাঁধা আর চরম অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তি পাচ্ছে না ইসলামাবাদ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au