অস্ট্রেলিয়ায় বেড়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার গাড়ির বাজারে। পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যে দেশটিতে দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) চাহিদা। সর্বশেষ বিক্রির তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে ইভি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মোট ১৫ হাজার ৮৩৯টি ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। এ সময়ে মোট নতুন গাড়ি বিক্রি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমলেও ইভির বাজার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত চার বছরের গড় হিসাবেও দেখা গেছে, পেট্রোলচালিত গাড়ির বিক্রি কমে এসেছে এবং ২০২৬ সালের প্রথম দিকে তা চার বছর আগের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিকল্প জ্বালানির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। অনলাইন অনুসন্ধান তথ্য বলছে, বছরের শুরু থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি সম্পর্কিত অনলাইন সার্চ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। একইভাবে গাড়ি বিক্রির অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও ইভি ক্যাটাগরিতে সার্চের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মার্চ মাসে মোট ১৫ হাজার ৮৩৯টি ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। ছবিঃ সংগৃহীত
গাড়ির শোরুমগুলোতেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। অনেক প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের ভিড় সামাল দিতে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দিতে হয়েছে। টেস্ট ড্রাইভ ও নতুন অর্ডারের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেড়েছে। বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও জানিয়েছে, জ্বালানি সংকট শুরুর পর থেকেই তাদের বিক্রি দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোলের বাড়তি দাম, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধির কারণে মানুষ এখন দীর্ঘমেয়াদি খরচ কমানোর দিকেই ঝুঁকছে। অনেকেই মনে করছেন, শুরুতে খরচ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈদ্যুতিক গাড়ি সাশ্রয়ী।
অনেক ক্রেতা জানিয়েছেন, আগে চার্জিং সুবিধার অভাব তাদের সিদ্ধান্তে বাধা ছিল। বিশেষ করে শহরের বাইরে এলাকায় চার্জিং সুবিধা সীমিত হওয়ায় তারা অপেক্ষা করছিলেন। তবে বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি সেই দ্বিধা অনেকটাই দূর করেছে। এখন অনেকেই মনে করছেন, পেট্রোলের ঘাটতি থাকলে যেভাবে পরিকল্পনা করে চলতে হয়, ইভির ক্ষেত্রেও একইভাবে পরিকল্পনা করা সম্ভব।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে চলাচলও বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে যানজট বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও গতি এসেছে। নিলাম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে পুরোনো ইভির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে মধ্যবয়সীরা বেশি আগ্রহী ছিলেন, এখন তরুণ ক্রেতারাই বাজারে এগিয়ে।
গাড়ির ব্যাটারি নিয়ে আগে যে শঙ্কা ছিল, সেটিও অনেকটাই কমেছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক পুরোনো ইভির ব্যাটারিও ভালো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পরও ব্যাটারির সক্ষমতা সন্তোষজনক থাকছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে চার্জিং নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, অনেক মানুষ একই সময়ে বাসায় ফিরে গাড়ি চার্জ দিলে বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এছাড়া সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে আসছে। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন বা যাদের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নেই, তাদের জন্য ইভি ব্যবহার কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সবাই সমানভাবে এই পরিবর্তনের সুবিধা নিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে চলাচলও বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে যানজট বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। পাশাপাশি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য করব্যবস্থাও নতুন করে ভাবতে হবে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এটি টেকসই করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো, নীতিগত সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং ভোক্তার দৈনন্দিন সিদ্ধান্তেও বড় প্রভাব ফেলছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ