বিশ্ব

লেবানন ইস্যুতে মুখোমুখি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টিরও বেশি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা “নিয়ন্ত্রিত বিরতি” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

  • 10:29 pm - April 09, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৮৭ বার
হরমুজ প্রণালী। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটেনি। একই সঙ্গে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বেড়েছে বলে হোয়াইট হাউস দাবি করলেও বিশ্লেষকদের তথ্যে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাড়ছে এবং পরিস্থিতি তারা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে সামুদ্রিক বিশ্লেষণ সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরদিন মাত্র ১১টি জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করেছে, যা আগের দিনের তুলনায় কোনো বৃদ্ধি নয়। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টিরও বেশি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা “নিয়ন্ত্রিত বিরতি” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রণালীর মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক নৌপথ এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে না। জাহাজগুলো কেবল ইরানের নিয়ন্ত্রিত সরু করিডর দিয়ে চলাচল করছে এবং তাদের ইরানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। এমনকি অনিশ্চয়তার কারণে অন্তত একটি জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সক্ষম বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী। দেশটির সামরিক প্রধান ডেভিড জনস্টন বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া চাইলে সেখানে নৌবাহিনী মোতায়েন করতে পারবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল সামরিক শক্তি সরিয়ে নিচ্ছে, তখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এই কারণে অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাছ ধরার নৌকা ও পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজ চলাচল করছে,
ছবিঃ সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ার ভেতরেও এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হ্যাস্টি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির কারণে সেখানে জাহাজ পরিচালনা নিরাপদ নাও হতে পারে। যদিও ডেভিড জনস্টন এই আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে অস্ট্রেলিয়া সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।

অন্যদিকে ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে পারেনি। তার দাবি, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননেও সংঘাত বন্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই অভিযোগ তুলে বলেছেন, লেবাননে গণহত্যা চলতে থাকলে যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থ থাকে না। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন দেখছে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কি না। একই সুরে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদে বলেন, একদিকে যুদ্ধবিরতির কথা বলা এবং অন্যদিকে মিত্রদের হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া একসঙ্গে চলতে পারে না।

এদিকে হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা হয়েছে কি না, তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান-সংযুক্ত কিছু গণমাধ্যম একটি মানচিত্র প্রকাশ করে দেখিয়েছে, প্রণালীর মূল নৌপথে সম্ভাব্য বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও বাস্তবে মাইন পাতা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়, তবে এমন আশঙ্কাই বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে যথেষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথগুলোর একটি। এখানে কোনো ধরনের সামরিক ঝুঁকি তৈরি হলে বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে। যদি প্রণালীতে মাইন থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে সেটি পরিষ্কার করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং ওই সময় পর্যন্ত নৌপথটি কার্যত অচল হয়ে থাকতে পারে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতাও বিতর্কের বাইরে নয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় আলোচনার অগ্রগতি হলেও তার এক বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই বিবৃতি প্রকাশের আগে হোয়াইট হাউস তা পর্যালোচনা করেছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিজে এটি লিখেননি।

এদিকে যুদ্ধবিরতির সময় ইরানের একটি ‘১০ দফা প্রস্তাব’ নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ইরান তাদের দাবি তুলে ধরলেও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সেটি সঠিক নয় এবং প্রকৃত প্রস্তাব ভিন্ন। তবে সেই বিকল্প প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা, লেবাননে চলমান সংঘাত এবং কূটনৈতিক মতবিরোধের কারণে পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়েছে। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্রঃ নিউজ.এইউ

এই শাখার আরও খবর

ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরও ৩ ককটেল বিস্ফোরণ

ঢাকায় পৃথক তিনটি স্থানে আরও তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে কাফরুল থানার সামনে ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর রামপুরা ও…

কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণ, বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা

ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি নির্জন স্থানে…

পার্থে ছুরিকাঘাতে ৪৪ বছর বয়সী ব্যক্তির মৃত্যু, গ্রেপ্তার একজন

অস্ট্রেলিয়ার পার্থের দক্ষিণাঞ্চলে ছুরিকাঘাতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের হোমিসাইড ইউনিট। এ ঘটনায় শনিবার এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। শুক্রবার স্থানীয়…

নিরপরাধ সিডনি বাসিন্দা হত্যায় বন্দুকধারীকে পালাতে সহায়তার অভিযোগ স্কুলশিক্ষকের বিরুদ্ধে

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ভুল পরিচয়ের শিকার হয়ে এক নিরপরাধ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এক স্কুলশিক্ষকের বিরুদ্ধে বন্দুকধারীকে পালাতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময়…

ফ্লিকের বার্সেলোনার কাছে রিয়ালের গোলের রেকর্ড হারানোর শঙ্কা

লা লিগায় দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছে হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা। মৌসুমের প্রথম ছয় ম্যাচেই জয় পেয়েছে কাতালান ক্লাবটি। এই ছয় ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ২৮ বার বল পাঠিয়েছে…

ঢাকায় রোববার ‘লকডাউন’, আগের রাতে একাধিক বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগের ঘোষিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচির আগের রাতে একাধিক বাসে আগুন এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au