ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য খাতে অচলাবস্থা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অর্জন ও কাঠামোগত উন্নয়ন হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিলের ফলে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এরই মধ্যে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাবসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াকে এই সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবচেয়ে সফল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। ১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দীর্ঘ সময় ধরে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে আসে এবং শিশু মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে বছরে দুইবার পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে তা কমিয়ে বছরে একবার করা হয়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা।
একইভাবে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও ছিল শিশুদের পুষ্টি ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো। কিন্তু এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ ও অপুষ্টি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কর্মসূচি বন্ধ থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় প্রভাব না দেখা গেলেও কিছুদিনের মধ্যেই শিশুমৃত্যু ও রোগপ্রবণতা বাড়তে শুরু করবে।
নিয়ন্ত্রিত রোগ ফের ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
গত এক দশকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ এর একটি বড় উদাহরণ। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আক্রান্তের হার ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৯৬ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে এই কর্মসূচির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। দেশে এখনো ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রতিরোধ কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সংক্রমণ আবার দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কালাজ্বরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই দশকের প্রচেষ্টায় এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মধ্যে পুনরায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি একবার ভেঙে গেলে পূর্বের অর্জন খুব দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে পরিবর্তিত আবহাওয়া। চলতি বছর শুরু থেকেই তাপমাত্রা বেশি এবং অকাল বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পরও কার্যকর প্রস্তুতি না থাকায় এবার আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা এবং সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অভাব ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে একদিকে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির স্থবিরতা, অন্যদিকে জলবায়ুজনিত প্রভাব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে দ্বৈত সংকট তৈরি হয়েছে।
অপারেশনাল প্ল্যান বাতিলে ভেঙে পড়ছে কাঠামো
স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা অপারেশনাল প্ল্যান বাতিলের সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা এই পরিকল্পনার আওতায় টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতো।
কিন্তু ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের পরিকল্পনা বাতিল করে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। পরবর্তীতে সেই প্রকল্পও বাস্তবায়িত না হওয়ায় কার্যক্রম আরও স্থবির হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হঠাৎ বন্ধ করলে তার প্রভাব পুরো ব্যবস্থার ওপর পড়ে, যার ফল এখন দৃশ্যমান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু বর্তমান কর্মসূচিই নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা কমে যাবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, কোনো ভিত্তিগত জরিপ ছাড়াই বড় ধরনের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে এবং এর বিকল্পও নির্ধারণ করা হয়নি, যা বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। একইভাবে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছিল, যা এখন হুমকির মুখে।
নতুন করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা
স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। বিশেষ করে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকা নয়, এর সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ ও কৃমিনাশক কর্মসূচি পুনরায় চালু করাও জরুরি।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অল্প বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে দেশের অর্জিত সাফল্য নষ্ট হয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পুনর্বহাল, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবন এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।
সূত্রঃ কালবেলা