বাংলাদেশ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল ও হিন্দুদের দেশত্যাগ: দীর্ঘদিনের সংকট কতটা গভীর

  • 6:36 pm - April 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩১৮ বার
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা, নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পত্তি দখল এবং সেই সম্পত্তি কার্যকরভাবে ফেরত দেওয়ার ব্যর্থতা দেশটির মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিএনপির বড় জয়ের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার ক্ষমতায় আসা সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে সংশয়ও তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শুরু হওয়া অন্তর্বর্তী শাসনামলে সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ ওঠে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় বিএনপি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। তবে অতীতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক বিতর্কিত ছিল। ১৯৭৭ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি সরিয়ে দেন এবং দলটির অনেক সদস্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।

এই প্রেক্ষাপটে, অতীতের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অনেক হিন্দু ভোটার বিএনপিকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেন। যদিও তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে তিনি এখনো স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেননি।

এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’কে দায়ী করা হয়, যা বহু বছর ধরে বৈষম্যমূলক আইন হিসেবে সমালোচিত। গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই আইন হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এর ফলে দেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

১৯৫১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী তা কমে ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। একই সময়ে অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে এমন বড় পতন দেখা যায়নি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত ২০১৬ সালে সতর্ক করে বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩০ বছরে বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়তে পারে। তার গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬৩২ জন এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ দেশত্যাগ করেছেন।

এই দেশত্যাগের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ভূমি দখলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাকিস্তান আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ এবং পরবর্তী ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’-এর ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ হিন্দু ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। ১৯৬৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ হিন্দু তাদের ২৬ লাখ একর জমি হারিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২৫ লাখ একর জমি হিন্দুদের কাছ থেকে দখল করা হয়েছে এবং দেশের প্রায় সব হিন্দু কোনো না কোনোভাবে এর শিকার হয়েছেন।

এই সম্পত্তির আর্থিক মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা ২০০০ সালের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশের সমান।

এই দখল প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক আইনগত কাঠামো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তানে প্রণীত বিভিন্ন আইন হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের পথ তৈরি করে। ‘ইস্ট বেঙ্গল এমার্জেন্সি রিকুইজিশন অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’ এবং পরে ‘ইভাকুয়ি প্রপার্টি আইন’-এর মাধ্যমে যারা দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অধীনে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে যারা দেশ ছাড়েননি, তাদেরও ‘ত্যাগকারী’ হিসেবে দেখিয়ে সম্পত্তি দখল করা হয়।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ চালু হয়, যার মাধ্যমে হিন্দুদের ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সম্পত্তি দখল করা হয়। অন্যদিকে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে এই আইন একইভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’ কার্যকর করা হয়, যা পূর্ববর্তী বৈষম্যমূলক আইনগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এই আইনের মাধ্যমে এমনকি সাময়িক অনুপস্থিতির কারণেও সম্পত্তি দখল করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের ঘটনা ঘটে।

২০০১ সালে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন আইন’ পাস করা হলেও এর শর্ত ছিল কঠোর। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন, নাগরিকত্ব প্রমাণসহ নানা জটিলতার কারণে অনেকেই তাদের সম্পত্তি ফেরত পাননি। পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধন হলেও বাস্তবায়নে নানা বাধা থেকে যায়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আদালতের রায় পাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে জমি ফেরত দেওয়া হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি এবং দুর্নীতির কারণে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি লড়াই চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আইনগত সংস্কার থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ফলে সংখ্যালঘু হিন্দুদের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—তারা কি সত্যিই সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে, নাকি এই দীর্ঘদিনের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে।

সূত্রঃ  EU Reporter

এই শাখার আরও খবর

জাতিসংঘে নতুন বিশ্ব মানচিত্র অনুমোদন, বদলাবে প্রচলিত মানচিত্রের ধারণা

বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে আফ্রিকার আয়তন বাস্তবের তুলনায় ছোট করে দেখানোর দীর্ঘদিনের সমালোচনার মধ্যে ‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে নতুন ধরনের বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন…

কেরালায় লরির সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষে ৮ শিক্ষার্থী নিহত

ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিশুর জেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুর শিক্ষার্থী বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। শনিবার(৫ সেপ্টেম্বর) পুলিশ জানায়,…

এয়ারবাস কেলেঙ্কারিতে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলে গ্রেপ্তার

এয়ারবাসের বিমান কেনাবেচায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ছেলে ও দেশটির সংসদ সদস্য নামাল রাজাপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। শুক্রবার দেশটির দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ…

কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় জ্বলছে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সদর দপ্তর

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরে রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। শুক্রবার দিনের আলোতে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি ভবনে সরাসরি ড্রোন আঘাত হানার ঘটনায়…

‘নো গ্যাস নো বিল, নো সার্ভিস নো ট্যাক্স’

গ্যাস সংকট ও নাগরিক সেবার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি গ্যাস…

দীর্ঘ সময় ইতালির ক্ষমতায় থাকা মেলোনিকে মোদির শুভেচ্ছা, কী ছিল বার্তায়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জর্জিয়া মেলোনি। এই সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au