শান্তি আলোচনায় বসতে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- ইসলামাবাদে এক গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছেছে। শনিবার নির্ধারিত এই আলোচনাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন করে গতিশীলতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও পাল্টা অবস্থান এই আলোচনাকে ঘিরে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইরানি সরকারি সূত্র জানায়, পাকিস্তানে পৌঁছানো ইরানি প্রতিনিধিদলের বিশেষ বিমানটির নাম “মিনাব ১৬৮” রাখা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ হামলার স্মৃতিকে বহন করছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ জন ইরানি নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে শিশু ছিল। ওই হামলায় মিনাব শহরের একটি স্কুল “শাজরায়ে তাইয়েবা” সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় বলেও জানানো হয়।
ইরানি পক্ষের অভিযোগ, ওই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকতে পারে, যদিও মার্কিন সামরিক তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত বলে ধারণা করছেন। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, ঘটনার তদন্ত চলমান রয়েছে।
পাকিস্তানে অবতরণের পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে বিমানের আসনে চারটি শিশুর ছবি, স্কুল ব্যাগ ও ফুল রাখা দেখা যায়। তিনি লিখেন, “এই ফ্লাইটে তারা আমার সহযাত্রী।”
ইসলামাবাদে পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, আলোচনায় ইরানের উদ্দেশ্য সৎ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা নেই। তিনি অভিযোগ করেন, গত এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আলোচনার মধ্যেই দুইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিকারের চুক্তিতে আগ্রহী হয় এবং ইরানের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করে, তাহলে তেহরানও আলোচনায় প্রস্তুত। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনাকে কৌশল বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে ইরান নিজেদের অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলও ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। বিমানটি অবতরণের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তাদের স্বাগত জানান।
মার্কিন প্রতিনিধি দলে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক উপদেষ্টা ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ভ্যান্স জানান, তিনি আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং যদি ইরান আন্তরিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত থাকবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের প্রতারণা বা কৌশল গ্রহণযোগ্য হবে না।
আলোচনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মার্কিন প্রতিনিধি বহনকারী বিমান “এয়ারফোর্স টু” প্যারিসে জ্বালানি বিরতি নেয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এই উদ্যোগকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। পাকিস্তান এ প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক প্রেক্ষাপটে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লেটার জানান, হিজবুল্লাহকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না এবং সংগঠনটি শান্তির পথে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
শনিবারের ইসলামাবাদ আলোচনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে একাধিক প্রস্তাব পেয়েছে, যা আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণযোগ্য নয় এবং হরমুজ প্রণালির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থানে থাকবে।
অন্যদিকে ইরানও ১৫ দফা একটি প্রস্তাবের কথা জানিয়েছে, তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের এই আলোচনা শুধু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সাম্প্রতিক সংঘাত এই আলোচনাকে কঠিন পথে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি