হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু
মেলবোর্ন, ১৪ এপ্রিল- দেশে ছোঁয়াচে রোগ হাম-এর প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে, একই সময়ে হামের…
মেলবোর্ন, ১৩ এপ্রিল- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও, এরপর পরিকল্পিত উসকানি, প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা এবং সবশেষে শত শত মানুষের উন্মত্ততায় সংঘটিত হলো আরও একটি মর্মান্তিক ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনা। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’-এ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর প্রধান পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে (শামীম রেজা বা জাহাঙ্গীর নামেও পরিচিত) কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটানো এই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়াবহ চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে।
হামলার সূত্রপাত ঘটে ৩ বছর আগের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ফিলিপনগর এলাকার ফেসবুক ব্যবহারকারীদের টাইমলাইনে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে মূলত ৭টি আইডি (তিনটি ফেসবুক পেজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি) থেকে এই উসকানিমূলক পোস্টগুলো করা হয়। এর মধ্যে ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’ নামের একটি পেজ অন্যতম।
শনিবার সকাল ৯টার দিকে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে পুলিশের এক কর্মকর্তা স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে নেওয়া হয় চাতুর্যের আশ্রয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতার কাছে দরবারের পরিস্থিতি জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
তিনি পুলিশকে জানান, আসরের নামাজের পর স্থানীয় মুসল্লিদের নিয়ে একটি বৈঠক আছে, তবে তা দরবারে নয়। নেতার কথায় সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ বারবার তাকে জেরা করে, কিন্তু তিনি তথ্য গোপন করেন। ততক্ষণে পুলিশের একাধিক টহল দল ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থান নেয় এবং বেলা ১১টার দিকে দুই-তিনজন পুলিশ সদস্য দরবারেও উপস্থিত হন। কিন্তু সংঘবদ্ধ উসকানির শিকড় যে কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা তখনো প্রশাসনের অজানা ছিল।
শনিবার বেলা ১টা থেকে শুরু করে পৌনে ৩টা পর্যন্ত দরবার শরিফে চলে নজিরবিহীন তাণ্ডব। বেলা ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে হঠাৎ করেই গ্রামের পাকা সড়ক ধরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোঁটা হাতে শত শত উত্তেজিত জনতা দরবারে এসে হামলে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক আহমেদ রাজুর মতে, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় তরুণ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীও ছিলেন।
হামলাকারীরা প্রথমেই দরবার শরিফ ঘেরাও করে ফেলে। এ সময় দরবারের ভেতরে প্রধান পীর শামীম এবং তার অন্তত দুজন অনুসারী অবস্থান করছিলেন। উত্তেজিত জনতা দরবারের বিভিন্ন কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং একপর্যায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও উন্মত্ত জনতার রোষানল থেকে দরবার বা পীর কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ষা করতে পারেনি। দফায় দফায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ফলে এলাকাটি একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। যে ভিডিওটি ছড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ডের উসকানি দেওয়া হয়েছিল, সেটি মূলত অন্তত তিন বছর আগের (২০২৩ সালের)। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, পুরোনো ওই ভিডিওটি কেন্দ্র করে আগেও এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তবে এরপর শামীমের এমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
কিন্তু শনিবার সেই পুরোনো ভিডিওর জের ধরেই শামীমের ওপর চরম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্থানীয়রা। বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ গুরুতর আহত অবস্থায় শামীম ও তার দুই অনুসারীকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক মো. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, শামীমকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখনো তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু সারা শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোপ ও পিটুনির গুরুতর জখম থাকায় বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হামলায় আহত বাকি দুজন বিপদমুক্ত বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে এই হত্যাকাণ্ড পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ সেখানে গিয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হামলাকারীরা সবাই স্থানীয় এবং চরম আক্রোশে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হয়।
ঘটনার পরদিন রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, “ধর্ম অবমাননা করা অন্যায়, তেমনি কোনো মানুষকে হত্যা করা, বাড়ি ভাঙচুর করা, হামলা চালানোও অন্যায়। আইনের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে।” বর্তমানে দরবারে অর্ধশতাধিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং বিজিবিও টহল দিয়েছে। পুলিশ এরই মধ্যে সাইবার স্পেসে ভিডিও ছড়ানো দুই-একটি পেজের অ্যাডমিন এবং হামলায় জড়িত ১৫ থেকে ১৮ জনকে শনাক্ত করেছে।
নিহতের বড় ভাই গোলাম রহমান জানান, তারা এই ঘটনায় কোনো মামলা করতে চান না। তিনি বলেন, “আমরা বুঝতে পারতেছি না আসলে কী করবো। আমার ভাই মারা গেছে। আমরা খুব নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না বলে মামলাও করতে চাই না।” অন্যদিকে দৌলতপুর থানার ওসি (তদন্ত) শেখ মোহাম্মদ আলী মোর্তুজা নিশ্চিত করেছেন যে, শামীমের বিরুদ্ধে ২০২১ সালেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলা ছিল এবং তিনি তিন মাস কারাভোগও করেছিলেন।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে মাজার ভাঙচুর, বাউলদের অনুষ্ঠানে হামলা এবং গণপিটুনির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। দেশে নতুন সরকার গঠনের পরপরই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, “মব কালচার শেষ।” কিন্তু তার এই ঘোষণার দুই মাসের মধ্যেই রাজধানীর শাহবাগে ‘সমকামী’ ও ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে নারী-পুরুষের ওপর হামলা এবং তার এক দিন পরেই কুষ্টিয়ায় এই পীর হত্যার ঘটনা ঘটল।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, মব সন্ত্রাসের মাত্রা ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ২০২৪ সালে যেখানে গণপিটুনিতে ১২৮ জনের প্রাণ গিয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ স্পষ্ট জানিয়েছেন, মব সহিংসতা যারাই করুক না কেন, আগের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়াই নতুন অপরাধের পথ তৈরি করে দিচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক ও লেখক আনু মুহাম্মদ এই ঘটনাগুলোকে সমাজের গভীরে প্রোথিত অসহিষ্ণুতার ফল বলে মনে করেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন ও লুণ্ঠনের অর্থনীতি সমাজে এমন এক ফ্যাসিবাদী চিন্তার জন্ম দিয়েছে যেখানে ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন পরিচয় বা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে শত্রু মনে করা হয়।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আগের মব সহিংসতার ঘটনাগুলোতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, নমনীয়তা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন পৃষ্ঠপোষকতা এই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করেছে। শাহবাগ ও কুষ্টিয়ার ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, হামলাকারী গোষ্ঠীগুলোর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা সংঘবদ্ধ হামলার মাধ্যমে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে তাদের নিজস্ব উগ্র চিন্তাধারা ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
কুষ্টিয়ার ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার দিকে ইঙ্গিত করে আনু মুহাম্মদ পূর্বের ঘটনাগুলোর শ্বেতপত্র প্রকাশ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান। তার মতে, প্রশাসন যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয় এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন না করে, তবে এই ‘মব সন্ত্রাস’ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au