লেবানন সংঘাতের দ্রুত অবসান চায় অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্যসহ ১০ দেশ
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ ১০টি দেশ লেবাননে চলমান সংঘাত দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের হত্যার ঘটনায়…
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার সরাসরি বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই উভয় পক্ষ আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের সময় ও স্থান চূড়ান্ত হয়নি, তবুও একাধিক সূত্র বলছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু একটা ঘটতে পারে।” তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে। তিনি বিশেষভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সম্ভাব্য আলোচনার জন্য পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এর আগে একই শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলেও সেটিই আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম দফার ওই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনার ম্যারাথন পর্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষ থেকে অংশ নেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো লিখিত সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে সেই বৈঠক ভেস্তে গেলেও যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়নি, বরং নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

১ম দফায় শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। ছবিঃ সংগৃহীত
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান চলছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠক নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে অভ্যন্তরীণভাবে প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, উভয় পক্ষই সরাসরি সংঘাত থেকে সরে এসে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক আইন ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে এবং শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই এবং আলোচনাই একমাত্র কার্যকর পথ। তাঁর ভাষায়, “শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় ফিরতে হবে এবং যেকোনো যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে।”
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আগামী ২১ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। এর আগে আবার আলোচনায় বসতে পারলে একটি অন্তর্বর্তী সমাধান বা অন্তত উত্তেজনা প্রশমনের পথ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বৈঠকেও মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সূত্রগুলো আরও বলছে, ইরান সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব ট্রাম্প প্রশাসন এই তিনজনের ওপরই ন্যস্ত করেছে। প্রথম দফার ব্যর্থ আলোচনার পর থেকেই তারা ইরানি পক্ষ ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এর মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য চুক্তির ভিত্তি তৈরির চেষ্টা চলছে।
আলোচনার সম্ভাব্য স্থান নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইসলামাবাদের পাশাপাশি তুরস্কের ইস্তাম্বুল এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভার নামও সামনে এসেছে। এই শহরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বৈঠকের জন্য পরিচিত এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম। শেষ পর্যন্ত কোন স্থান নির্বাচন করা হবে, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা, কৌশলগত সুবিধা এবং উভয় পক্ষের সম্মতির ওপর।
আলোচনার মূল ইস্যুগুলো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই কর্মসূচি দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত রাখতে, যেখানে ইরান তুলনামূলক কম সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী। এই মতপার্থক্যই আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে, যার পরিমাণ ৪৫০ কেজির বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই ইউরেনিয়াম একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পারমাণবিক স্থাপনায় চাপা পড়ে আছে। অন্যদিকে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা চাইলে এই মজুত সরিয়ে নিতে পারে অথবা এর মাত্রা কমিয়ে বেসামরিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা হলে তা একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই প্রণালির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোও এ পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একটি আলাদা জোট গঠন করে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা করছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে উদ্দেশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমালোচনা করেছেন, ইরান ইস্যুতে তাঁর ‘সাহসের অভাব’ রয়েছে বলে মন্তব্য করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মেলোনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের প্রকাশ্য মতবিরোধ মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও চাপা উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বৈঠক শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হতে পারে। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, তবে তা বৃহত্তর সংঘাত এড়াতে সহায়ক হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au