ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর সরাসরি বৈঠকে বসেছে ইসরায়েল ও লেবানন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর সরাসরি বৈঠকে বসেছে ইসরায়েল ও লেবানন। তবে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে ঘিরে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, কারণ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই উদ্যোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে ‘অর্থহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তরের সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় এই বৈঠক শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ হলো, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এই বৈঠককে ‘খোলামেলা, সরাসরি ও উচ্চপর্যায়ের’ আলোচনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসা এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম। পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত, লেবাননের সঙ্গে নয়, তাই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সংলাপ হওয়া স্বাভাবিক।

লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা। ফাইল ছবি
এই আলোচনার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র সংঘাত। লেবাননের বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় হামলার অভিযোগ রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। পাল্টা হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করছে এবং দক্ষিণ লেবাননে দুই পক্ষের মধ্যে স্থলযুদ্ধও চলছে। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী-শিশু ও চিকিৎসাকর্মীও রয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১২ লাখ মানুষ।
লেবানন সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এই আলোচনার মাধ্যমে অন্তত একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ইসরায়েল স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগ্রহী নয়; বরং তাদের প্রধান লক্ষ্য হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করা।
ইসরায়েলের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ লেবাননকে তিনটি নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করার ধারণা। সীমান্তসংলগ্ন প্রথম অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় অঞ্চলে ধীরে ধীরে লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। আর তৃতীয় অঞ্চলে সম্পূর্ণভাবে লেবাননের সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেবে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগ চালাবে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে ‘বাফার জোন’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাও বিবেচনায় রয়েছে, যা অতীতে পরিত্যক্ত হয়েছিল।
লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী গাসান সালামে এই বৈঠককে ‘প্রাথমিক আলোচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, লেবাননের হাতে খুব বেশি কৌশলগত শক্তি নেই, তবে সরকার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ইরান-সম্পর্কিত প্রভাব থেকে নিজেদের আলাদা রাখতে চায়। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা নাইম কাসেম। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে হিজবুল্লাহ এই আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটির নেতা নাইম কাসেম বলেছেন, এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করা। তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে ‘একতরফা ছাড়’ হিসেবে আখ্যা দেন। হিজবুল্লাহর মতে, চলমান হামলার মধ্যে আলোচনায় বসা মানে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করা।
তাদের দাবি, ইসরায়েল আগে দক্ষিণ লেবানন থেকে সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তারা বলছে, তাদের অস্ত্র লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এটি কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেই আলোচনার বিষয় হতে পারে।
লেবাননের ভেতরেও এই বৈঠক নিয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রাজধানী বৈরুতে ইতোমধ্যে বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে অনেকেই সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তকে জনগণের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সরাসরি আলোচনা আয়োজন করেছে মূলত ইরানের প্রভাব কমানোর কৌশল হিসেবে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় লেবানন একটি ‘কৌশলগত হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল দ্রুত এই সংলাপে যুক্ত হয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেয়েছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় তাৎক্ষণিক কোনো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইসরায়েলের সামরিক অগ্রযাত্রা এবং দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ শহর বিন্ত জবেইল ঘিরে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণই আলোচনার ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর শুরু হওয়া এই সরাসরি সংলাপ কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অগ্রগতি কতটা হবে তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে। মাঠের পরিস্থিতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং হিজবুল্লাহর কঠোর অবস্থান এই উদ্যোগকে সফলতার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা