বিশ্ব

আবেদন কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ

ভিসা জটিলতা ও ব্যয়বৃদ্ধিতে কানাডা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা

  • 3:52 pm - April 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১২৪ বার
কানাডা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- এক সময় কানাডা ছিল ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিদেশি গন্তব্যগুলোর একটি। উচ্চশিক্ষা, কাজের সুযোগ এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সম্ভাবনা মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবণতায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্রোশিওর হাতে নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। ইতালি, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়ার মতো গন্তব্যে আগ্রহ বাড়লেও এক সময়ের শীর্ষ পছন্দ কানাডা এখন অনেকটাই অনুপস্থিত।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শোভিত আনন্দ জানান, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগ আবেদনই কানাডার জন্য ছিল। কিন্তু এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তার ভাষায়, কানাডায় আবেদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও অনেক বেড়েছে, ফলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দ্রুত কমছে।

কানাডার পার্লামেন্টে দাখিল করা অডিটর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ নেমে এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশে। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ভিসা ও অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ২০২৩ সালের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এর মধ্যে অন্যতম। যদিও বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উন্নতির দিকে।

দীর্ঘদিন ধরে কানাডা ভারতীয় মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের কাছে একটি সহজ ও নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। তুলনামূলক কম খরচে ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া এবং পরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাওয়া যেত। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হতো বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।

কানাডা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ছবিঃ সংগৃহীত

কিন্তু ২০২৪ সালের শুরুতে কানাডা বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে দুই বছরের জন্য সীমা আরোপ করে। বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার স্টাডি পারমিট নির্ধারণ করা হয়, যা স্নাতক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে বড় ধাক্কা দেয়। যদিও স্নাতকোত্তর কোর্সে এই সীমা প্রযোজ্য হয়নি।

একই সময়ে দেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং চাকরির বাজার আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় শহরগুলোতে ভাড়া দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক শর্ত আরও কঠিন করা হয়।

এর পাশাপাশি, কানাডায় পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক নিশ্চয়তা হিসেবে যে গ্যারান্টিড ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট বা জি আই সি জমা দিতে হয়, তা ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজারের বেশি করা হয়।

শিক্ষা পরামর্শকরা বলছেন, অনেক পরিবারের জন্য এই অর্থ জোগাড় করা কঠিন। তার ওপর ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি থাকায় অনেকে আর আবেদন করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

ভিসা পাওয়াও এখন আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী প্রবাহ নিয়ে কাজ করা সংস্থা আইসিইএফ মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় স্টাডি পারমিট প্রত্যাখ্যানের হার ২০২৩ সালে ৩৮ শতাংশ ছিল, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৫২ শতাংশে পৌঁছায়।

ভারতের মতো দেশে, যেখানে বিদেশে পড়াশোনা একটি বড় আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়, সেখানে এত বড় ঝুঁকি নিতে পরিবারগুলো এখন অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছে।

ফলে এখন প্রশ্ন বদলে গেছে, কানাডায় কীভাবে যাওয়া যাবে তা নয়, বরং আদৌ যাওয়া উচিত কি না।

শিক্ষা পরামর্শক শোভিত আনন্দ বলেন, এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বাস্তব ভয় তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, সেখানে গেলেও সবকিছু সামলানো সম্ভব হবে কি না।

অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগে দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য যে স্টুডেন্ট ডিরেক্ট স্ট্রিম বা এসডিএস ব্যবস্থা ছিল, সেটি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট আর্থিক ও ভাষাগত শর্ত পূরণ করলে দ্রুত ভিসা পাওয়া যেত।

এই ব্যবস্থায় ভারতীয়দের অনুমোদনের হার ২০২২ সালে ৬১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯৮ শতাংশে পৌঁছায়। তবে এর সঙ্গে জাল আবেদন, ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা এবং আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধির মতো অভিযোগও ওঠে। ফলে ২০২৪ সালের শেষ দিকে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং ভিসা যাচাই আরও কঠোর করা হয়।

চাকরির বাজারও বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সময় অনেক বেসরকারি কলেজ দ্রুত বিস্তার ঘটায়, কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানই মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারেনি। ফলে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলাফল হিসেবে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনার উচ্চ খরচও তুলতে পারছেন না।

একজন শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে শিক্ষা পরামর্শক জানান, দুই বছর আগে কানাডায় যাওয়া এক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করার পর স্থায়ী চাকরি না পেয়ে পার্টটাইম কাজ করে জীবন চালাতে বাধ্য হন এবং পরে দেশে ফিরে আসেন।

কানাডার মেকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি বলেন, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একদল মূলত উচ্চমানের শিক্ষার জন্য শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, আরেক দল অভিবাসনের সুযোগ হিসেবে ছোট কলেজগুলোকে বেছে নেয়।

সরকারি ভিসা সীমাবদ্ধতার মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা, যারা কম খরচে স্থায়ীভাবে থাকার পথ খুঁজছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন মেকগিল তুলনামূলকভাবে এই সংকট থেকে কম প্রভাবিত হয়েছে, কারণ সেখানে মূলত একাডেমিক মানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়।

কূটনৈতিক সম্পর্কেও কিছু উন্নতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি ভারত সফর করেন এবং বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি তার সঙ্গে ছিলেন। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা ও বৃত্তি কর্মসূচি বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে।

তবে শিক্ষার্থীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন আর আগের মতো সহজ নয়।

১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি আগে কানাডায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু ভিসা জটিলতা ও ভর্তি সীমাবদ্ধতার কথা শুনে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত তিনি আবার কানাডায় আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারণ তার পরিবার সেখানে থাকে এবং সুযোগ তুলনামূলকভাবে ভালো বলে তিনি মনে করেন।

কানাডা এখনো তিন বছর পর্যন্ত পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট দেয়, যা এখনো বড় আকর্ষণ। তবে সেই সুযোগ থাকলেও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর আগের মতো সহজ নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাকরির অনিশ্চয়তায় অনেক শিক্ষার্থী এখন পড়াশোনা শেষে স্থায়ীভাবে জীবন গড়তে হিমশিম খাচ্ছেন।

এক সময় কানাডার স্টাডি পারমিট মানেই ছিল চাকরি, স্থায়ী জীবন এবং বিদেশে ভবিষ্যৎ গড়ার নিশ্চয়তা। এখন সেই নিশ্চয়তা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডা এখন আর শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে মাঠে মমতা, বিজেপি হটানোর নতুন কর্মসূচির ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৩ জুন- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন…

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন খলিলুর রহমান

মেলবোর্ন, ৩ জুন- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ…

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত, ফিরল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশনা

মেলবোর্ন, ৩ জুন- দেশে বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তকে…

বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তোফায়েল আহমেদ

মেলবোর্ন, ২ জুন- মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসনের নয়বারের সাবেক সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদকে তার নিজ ইচ্ছা…

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের, পরিবর্তন এসেছে আবেদন ও ভর্তি প্রক্রিয়ায়

মেলবোর্ন, ২ জুন- অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাত্রার…

গর্ভপাতের জন্য থালাপতি বিজয়কে দায়ী করলেন অভিনেত্রী জুলি

মেলবোর্ন, ২ জুন- দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়কে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিনেত্রী ও সাবেক নার্স জুলি দাবি করেছেন,…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au