ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- আজ ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনবদ্য দিন। একাত্তরের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের…
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সহিংসতা বাড়ানোর নির্দেশ কারা দিয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে নানা তথ্য সামনে আসছে। নর্থইস্ট নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতা অন্তত দুইজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যে, সরকার পতনের আগের দিনগুলোতে “আরও লাশ পড়া দরকার”। এই পরিকল্পনার বিষয়ে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে নিয়মিতভাবে অবহিত করেছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স(ডিজিএফআই) এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন আল মোরশেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটিকে ব্রিফ করেন। এতে বলা হয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের সরকারবিরোধী করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জাগলুল আহমেদ ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর ফেরদৌসকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানানো হয়, মেজর (অব.) ফেরদৌস বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। আরও জানানো হয়, বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তা, বরখাস্ত সেনাসদস্য, বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা এবং ভাড়াটে খুনিরা সমন্বিতভাবে “আরও লাশ ফেলার” পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে।
এছাড়া তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানানো হয়, ঢাকায় অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কিছু কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইসের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ পথচারী, দিনমজুর, দোকানকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষী। মাত্র চার থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী লক্ষ্য করে হত্যা করা হয়। দূরপাল্লার অজ্ঞাত স্নাইপারদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এসব হত্যাকাণ্ডের দায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুলিশের ওপর চাপানো, যাতে তরুণ সমাজ সরকারবিরোধী হয়ে ওঠে। এই কৌশল সফল হয় বলেও দাবি করা হয়।
এই সময় ‘অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী’র কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে মনোযোগ ও সমর্থন পেতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে সেনাবাহিনী তৎকালীন সরকারের পরিবর্তে এসব গোষ্ঠীকে রক্ষা করেছে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্টের পরও বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনীর তেমন কার্যক্রম দেখা যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি ‘নীরব অভ্যুত্থান’ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৫ আগস্টের মধ্যে তা রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যদিও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পদে বহাল থাকেন, তবে ক্ষমতা একদল ‘বিশ্বাসঘাতক’ কর্মকর্তার হাতে চলে যায় বলে দাবি করা হয়।
নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্যাডেট কলেজ ও নন-ক্যাডেট কলেজ পটভূমির কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে। এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয় যখন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান নেতৃত্বে আসেন। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই তিনজনকে সামরিক মহলে ‘ডিপ স্টেট’ নামে অভিহিত করা হতো বলেও দাবি করা হয়।
কিছু সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা রয়েছে যে রাজনৈতিক নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অযোগ্য এবং সেনা কর্মকর্তারাই বেশি সক্ষম। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে অন্তত চারবার সামরিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন।
২০২৩ সালের ২৪ জুলাই নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানের নিয়োগের পর থেকেই সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপ শুরু হয় বলে দাবি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হলে পরিকল্পনা কিছুটা পিছিয়ে যায় এবং পরে ভারতের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তা বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়।
এ সময় অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসান, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স-এর মেজর জেনারেল হামিদুল হক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল টি এম জোবায়েরসহ সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাওয়া ক্লাবেও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত বৈঠক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এর আগেই মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা টেরেন্স অরভিল জ্যাকসন ঢাকায় আসেন বলে জানা যায়। তার পরামর্শে সামরিক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা কৌশল নির্ধারণ করেন।
গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এমন তথ্যও রয়েছে বলে দাবি করা হয়, ৫ আগস্ট সরকার পতনের ঘটনায় বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্পৃক্ততা ছিল। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স-এর তত্ত্বাবধানে কর্মরত, বরখাস্ত ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য, বিদেশি গোষ্ঠী এবং ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ সমন্বিতভাবে সহিংসতা চালায়।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু সামরিক ইউনিট ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকেও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। যদিও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য ছিল, তবুও তা যথাযথভাবে সরকারকে জানানো হয়নি বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
৫ আগস্টের পরবর্তী সময়কে ঘিরে দাবি করা হয়, প্রায় ১৫ মাস ধরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন ছিল। এই সময় যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের নিয়মিত সফর এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও ওঠে।
সরকার পতনের ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বেশ কয়েকজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ আগে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বরখাস্ত বা শাস্তিপ্রাপ্ত ছিলেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার তথ্যও রয়েছে।
তাদের অনেকেই ‘অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী’র অংশ হিসেবে কাজ করেছেন এবং সরকার পতনে ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করা হয়। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ভারতীয় ও রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের এই ‘নীরব অভ্যুত্থান’-এর প্রধান রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে বিএনপির নাম উঠে এসেছে। তবে কেন কিছু সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সরকার অপসারণে সমর্থন দিয়েছেন, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজল বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au